হাম: একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
হাম বা রুবিওলা (Rubeola) একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও তীব্র ভাইরাসঘটিত সংক্রামক রোগ। প্যারামক্সিভাইরাস গোত্রের মর্বিলিভাইরাসগণের অন্তর্গত ভাইরাসের কারণে এই রোগটি ঘটে। এটি শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায় এবং বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হামের প্রাথমিক উপসর্গসমূহ
হামের প্রথম কয়েকদিনে সাধারণ সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- নাক দিয়ে পানি পড়া
- উচ্চমাত্রার জ্বর (১০৩-১০৫° ফারেনহাইট)
- শুকনা কাশি
- গলা ব্যথা
- চোখ লাল হয়ে যাওয়া
প্রায় ২-৪ দিন পর মুখের ভেতরে ছোট ছোট সাদা দাগ (কপলিক দাগ) দেখা যায়। এরপর ৩-৫ দিনের মধ্যে শরীরে লালচে ছোপ ছোপ ফুসকুড়ি দেখা দেয় যা প্রথমে মুখে শুরু হয়ে গলা, ঘাড় এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই ফুসকুড়ি সাধারণত ৫-৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
হামের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি
হাম শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। প্রধান জটিলতাগুলো হলো:
- নিউমোনিয়া: ফুসফুসে সংক্রমণ
- মেনিনজাইটিস: মস্তিষ্কের ঝিল্লির প্রদাহ
- অন্ধত্ব: চোখের মারাত্মক ক্ষতি
- খিঁচুনি: স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হামের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ইনফেকশন হয়ে মস্তিষ্কের প্রদাহ, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে যা মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
হামের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
হামের কোনো সুনির্দিষ্ট এন্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করা হয়। তবে হাম থেকে রক্ষা পাওয়ার সর্বোত্তম উপায় হলো হামের টিকা গ্রহণ। নির্ধারিত ২টি ডোজ টিকা নেওয়ার পর হাম প্রতিরোধে ৯৭% কার্যকর সুরক্ষা পাওয়া যায়।
হামে আক্রান্ত হলে করণীয়:
- রোগীকে অবশ্যই আইসোলেশনে রাখতে হবে
- শরীরের সঠিক হাইড্রেশন বজায় রাখতে হবে
- পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে
- জ্বর নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ সেবন করতে হবে
- ভিটামিন এ সম্পূরক গ্রহণ করতে হবে
- তাত্ক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
সচেতনতা ও প্রতিরোধের উপায়
হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমাতে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো টিকা দেওয়া এবং হাম হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা এই রোগ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। হামের ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং সংক্রামক কণাগুলো দুই ঘণ্টা পর্যন্ত পৃষ্ঠের উপর সক্রিয় থাকে।
বেশিরভাগ রোগী ৭-১০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন, তবে জটিলতা দেখা দিলে তা মারাত্মক হতে পারে। হাম হলে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং সময়মতো ভ্যাকসিন দেওয়া এই রোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
লেখক: ডা. আয়েশা আক্তার, উপ-পরিচালক, ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতাল



