গতকাল সকাল থেকেই মারগাঁও শহরে গরমের তীব্রতা বাড়ছিল। কিন্তু মনে তখন অন্য এক রোমাঞ্চের হাওয়া। কোনো বিস্তীর্ণ সৈকত বা পর্তুগিজ স্থাপত্যের টানে নয়, এই প্রতিবেদকের ব্যাকুলতা বাড়ছিল গোয়ার ফুটবল সংস্কৃতির এক জীবন্ত ইতিহাসকে দেখার জন্য। আয়তনে ভারতের সবচেয়ে ছোট রাজ্যের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ফুটবল আখ্যানের খোঁজে গতকাল সকালে পাশের শহর ভাস্কো দা গামার দিকে যাত্রা। গন্তব্যস্থান কিংবদন্তি ‘ভাস্কো স্পোর্টস ক্লাব’।
একটা সময় এই ক্লাবটি দারুণ ফুটবল উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছিল গোয়ায়। গোয়ার রুপালি সমুদ্রসৈকতে প্রতিবছর তাদের আয়োজিত আন্তর্জাতিক ম্যারাথন প্রতিযোগিতারও নামডাক অনেক। ফুটবল আর ম্যারাথনের মেলবন্ধনই ক্লাবটিকে অনন্য করে তোলে। তারই আঙিনায় পা রাখার তীব্র কৌতূহল নিয়ে ভাস্কো শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটা দুপুর ছুঁই ছুঁই।
গরমের মধ্যে ঐতিহ্যের সন্ধানে
সূর্য তখন মাঝ আকাশে। গায়ে হুল ফোটানো গরম আর রোদের তেজে কোথাও দাঁড়ানোই মুশকিল। তবু স্থানীয় লোকজনের ছাতা বা রোদচশমা ব্যবহারের বালাই নেই। গা পোড়ানো গরম যেন তাঁদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
ভাস্কো শহরের কেন্দ্রে ক্লাবের মূল অফিস রুক্মিণী টাওয়ার্সের নিচতলায়, ঠিক তিলক ময়দান স্টেডিয়ামের বিপরীতে। অফিস কক্ষে পা রাখতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। তার ওপর ক্লাবের অফিস কর্মী লুরিয়ানো রেমন্ড যেভাবে স্বাগত জানালেন, তা এককথায় অসাধারণ। ক্লাব রুম ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে সাজানো ট্রফিগুলোর ইতিহাস বললেন। ক্লাবের অফিশিয়াল জার্সিসহ বেশ কিছু স্মারকও উপহার দেন। থরে থরে সাজানো ছোট-বড় ১১৬ ট্রফি অ্যান্ড শিল্ড। ক্লাবটির বহু বছরের গৌরবময় লড়াই আর সাফল্যের নীরব সাক্ষী এসব স্মারক দেখাটাও দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
গোয়ার প্রথম ফুটবল ক্লাবের জন্মকথা
গোয়ার প্রথম ফুটবল ক্লাব হিসেবে ১৯৫১ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয় ভাস্কো স্পোর্টস ক্লাব। তৎকালীন গোয়া ছিল পর্তুগালের উপনিবেশ। পর্তুগিজ গ্যারিসন বা সেনাবাহিনীর পর্তুগিজ সৈনিকেরা নিয়মিতই ফুটবল খেলতেন। তাঁদের হাত ধরেই যাত্রা করা ক্লাবটির প্রথম সভাপতি ছিলেন পর্তুগিজ সৈনিক তেনেন্তে আভিলা।
ক্লাব কক্ষে ঢুকতেই চোখে পড়ল বিখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামার মূর্তি। তাঁর নামানুসারেই শহরটির নামকরণ এবং সেই সূত্রেই ক্লাবের নাম ‘ভাস্কো স্পোর্টস ক্লাব’। অবশ্য শুরুতে এর নাম ছিল ‘ক্লুব দেসপোর্তিভ ভাস্কো দা গামা’, সংক্ষেপে সিডিভিজি। পর্তুগিজ নাম। ১৯৬১ সালে পর্তুগিজ থেকে গোয়া স্বাধীনতা পেলে নাম হয় ‘ভাস্কো স্পোর্টস ক্লাব’।
পর্তুগিজরা ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব ‘ক্লাব দে রেগাতাস ভাস্কো দা গামার’ ভক্ত ছিল। ব্রাজিলের সেই ক্লাবের জার্সির অনুকরণে ভাস্কোর জার্সিতেও সাদার ওপর কালো স্ট্রাইপ আঁকা, বুকে লাল রঙের ক্রস চিহ্ন।
জনতার ক্লাব হিসেবে পরিচিতি
ভারতীয় ফুটবলে এই ক্লাবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। এটিই গোয়ার প্রথম ফুটবল ক্লাব, যা পুরোপুরি জনসাধারণের অর্থায়নে পরিচালিত হতো। অর্থাৎ কোনো একক শিল্পপতির পকেটের টাকায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের মালিকানা ও সহযোগিতায় চলত ক্লাবটি। যে কারণে এ ক্লাবটিকে বলা হয় জনতার ক্লাব। এখনো সে নিয়মই চালু রয়েছে। ক্লাবের সদস্যসংখ্যা ১৬০ জন। ক্লাবের ঠিক পাশেই হোম গ্রাউন্ড তিলক ময়দান স্টেডিয়াম। গ্যালারিতে আসনসংখ্যা ৮-১০ হাজার। ভাস্কো ক্লাব কখনো গোয়ান লিগে অবনমিত হয়নি। ক্লাবটির সিনিয়র, অনূর্ধ্ব-২০, ১৬ ও ১৪ দল আছে। গোয়ান জুনিয়র লিগে খেলে বয়সভিত্তিক দলগুলো।
ভাস্কো বন্দরনগরী। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভাস্কো ক্লাবকে ‘দ্য পোর্ট টাউনার্স’ বা বন্দরনগরীর দল বলেও ডাকা হয়। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ক্লাবটি সাফল্যের শিখরে পৌঁছায়। ১৯৬৬ সালে প্রথম গোয়ান দল হিসেবে বোম্বেতে ‘ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন চ্যাম্পিয়নশিপ’, ১৯৬৯ সালে প্রথম গোয়ান দল হিসেবে বিখ্যাত ‘সাইত নাগজি ফুটবল টুর্নামেন্ট’ জয় এবং ১৯৭০ সালে গোয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ডেম্পো ক্লাবকে ১–০ গোলে হারিয়ে মর্যাদাপূর্ণ বান্দোদকর গোল্ড ট্রফি জয় তাদের বড় গৌরবের অংশ।
বিদেশি খেলোয়াড় ও সোনালি সময়
ক্লাবটির বিদেশি খেলোয়াড়দের তালিকায় একটি নাম বেশ চমকেই দেয়। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ঢাকা আবাহনীতে আসার আগে শ্রীলঙ্কান তারকা ডিফেন্ডার নিজাম পাকির আলী কিছুদিন খেলেছেন এই ক্লাবে। নিজেদের সোনালি সময়ে ভাস্কো ঘরোয়া লিগে এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তাদের চার তারকা খেলোয়াড় অ্যান্ড্রু, বার্নার্ড, কাতাও এবং ডমিনিককে একসঙ্গে ভারতীয় ফুটবলের বিখ্যাত ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ বলা হতো। পরে তারা ভারতের ন্যাশনাল লিগ এবং আই লিগেও দাপটের সঙ্গে খেলেছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ৭৫ বছর পূর্তি
ক্লাবের ফুটবল ও প্রশাসন সম্পাদক মারিও ডিসুজার সঙ্গে কথা হলো মুঠোফোনে। ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানাতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘দক্ষিণ গোয়া বিমানবন্দরের কাছে গোয়া সরকার থেকে কিছু জমি কিনেছি আমরা। ক্লাব ভবন, মাঠসহ নানা কিছু হবে সেখানে। এ বছর ক্লাবের ৭৫ বছর পূর্তিও উদ্যাপন করব।’
বাংলাদেশি সাংবাদিক ক্লাবে এসেছেন শুনে তাঁর উচ্ছ্বাসটা ফোনের এ প্রান্ত থেকেও টের পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু মারিও ডিসুজা কি জানলেন, ইতিহাসের সাক্ষী ভাস্কো স্পোর্টস ক্লাবে এক বেলা ভ্রমণ কী দারুণ স্মৃতি হয়ে থাকবে যে কারও জন্য!



