সিরাজগঞ্জে প্রথম বাণিজ্যিক জারবেরা চাষে সফল ফজলুল হক
সিরাজগঞ্জে প্রথম বাণিজ্যিক জারবেরা চাষে সফল উদ্যোক্তা

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া পৌর শহরের চর ঘাটিনা গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা ফজলুল হক প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে বিদেশি জারবেরা ফুল চাষে সফল হয়েছেন। এক বিঘা জমির বাগান থেকে এ বছর প্রায় ২ লাখ ফুল উৎপাদনের আশা করছেন তিনি, যা থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লাভ হতে পারে।

চাকরি ছেড়ে কৃষিতে সফলতা

ফজলুল হক ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি জাহাজ তৈরির কারখানায় কাজ শুরু করেন। সেখানে দীর্ঘ এক যুগ কাজ করার পর চাকরি ছেড়ে ২০১৪ সালে ব্যবসা শুরু করেন। শুরুতে লাভ হলেও ২০২০ সালে করোনার কারণে ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন। পরে রোজগারের জন্য কৃষিকাজ শুরু করেন।

ইউটিউব দেখে শুরু

ফজলুল হক জানান, ইউটিউব দেখে ২০২০ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যভাগে পরীক্ষামূলকভাবে বাবার ৫ বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে ফল ও সবজি চাষ শুরু করেন। তাতে একের পর এক সফলতা আসতে থাকে। এরপর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় দুই বিঘা জমিতে পলিনেট হাউস তৈরি করেন। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে ভারত থেকে সংগ্রহ করা চারা দিয়ে এক বিঘা জায়গায় জারবেরা ফুলের চাষ করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জারবেরা বাগানের বর্তমান অবস্থা

সম্প্রতি চর ঘাটিনা এলাকায় ফজলুল হকের কৃষি খামারে গিয়ে দেখা যায়, মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে বিশাল এলাকায় আগাম সবজি চাষ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পলিনেট হাউসের ভেতরে শোভা পাচ্ছে লাল, হলুদ, সাদাসহ নানা রঙের জারবেরা ফুল।

ফজলুল হক বলেন, এক বছর আগে পলিনেট হাউসের ভেতরে এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ৩ হাজার জারবেরার টিস্যু কালচার চারা রোপণ করা হয়। চারা বাবদ খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকা, সব মিলিয়ে ২ লাখ টাকা। শুরুতে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করলেও দুই মাসের মাথায় গাছগুলোয় ফুল আসতে শুরু করে এবং তিন মাসের মাথায় সব গাছের ফুল এসে যায়। বর্তমানে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ ফুল সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারে ৭-৮ টাকায় পাইকারি বিক্রি হয়। সারা দেশের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও এই ফুলের চাহিদা রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লাভের পরিমাণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্রথম অবস্থায় বাবার ৫ বিঘা জমিতে সবজি চাষ দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে ২০ বিঘা জমিতে কৃষি খামার চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতে জারবেরা ফুলের খামার আরও বড় আকারে করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, 'অনেক বাধা ছিল। কিন্তু এখন সফলতা পেয়ে ভালো লাগছে। এ বছর খরচ বাদ দিয়ে শুধু জারবেরা ফুল চাষেই প্রায় ১০ লাখ টাকা লাভের আশা করছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের বেকার ভাই-বোনেরাও জারবেরা ফুল চাষ করে লাভবান হতে পারেন।'

ঈদ, পূজা, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, পয়লা বৈশাখ, ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চে এই ফুলের চাহিদা বেশি থাকে। ফুলের বাজার ভালো থাকলে প্রতিটি ফুল ১৪-১৫ টাকায় বিক্রি হয়।

অন্যান্য উদ্যোক্তাদের আগ্রহ

জারবেরা ফুলের খামার দেখতে এসে কৃষি উদ্যোক্তা পাপিয়া সরকার বলেন, স্থানীয় বাজারে ফুল বিক্রেতাদের কাছে খবর পেয়ে তিনি এখানে এসেছেন। নানা রঙের জারবেরা ফুল তার অনেক ভালো লাগে। ভবিষ্যতে বাড়ি আঙিনায় ছোট আকারে হলেও একটি জারবেরা বাগান করতে চান তিনি।

চাষ পদ্ধতি ও যত্ন

ফজলুল হক জানান, পানিসহনশীল না হওয়ায় জারবেরা ফুল চাষ করতে পলিনেট হাউস আবশ্যক, গ্রিনহাউস হলে আরও ভালো। বেলে-দোঁআশ মাটিতে লম্বা আকারে বেড তৈরি করতে হয়, এক বেড থেকে অন্য বেডের দূরত্ব ২৪ ইঞ্চি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ১৩ ইঞ্চি। জারবেরা সারা বছর ফোটে, তবে অক্টোবর থেকে মার্চে বেশি ফুল ফোটে। বছরে একটি গাছ থেকে প্রায় ২০০টি ফুল পাওয়া যায়, প্রতিটি ৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়। টানা তিন বছর পর্যন্ত ফুল পাওয়া যায়, তারপর নতুন করে চারা লাগাতে হয়।

পোকা দমন ও সার প্রয়োগ

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, জারবেরা ফুলের সবচেয়ে বড় শত্রু লাল মাকুর। এই পোকার হাত থেকে রক্ষায় ককোডাস, পটাশ, টিএসপি ও দস্তা সংমিশ্রণের সার ব্যবহার করতে হয়। পর্যাপ্ত রোদ ও বাতাস চলাচলের সুযোগ রেখে চাষ করতে হবে। জৈব সার ব্যবহার ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে লাভবান হওয়া সম্ভব।

কৃষি বিভাগের সহায়তা

উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন বলেন, 'বর্তমানে আমাদের এলাকায় বেলে-দোঁআশ মাটিতে জারবেরা ফুল চাষ সম্ভব হচ্ছে। স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা ফজলুল হক সফল হয়েছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।'

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, জারবেরা ফুল বহুবর্ষজীবী। বিদেশি ফুল হলেও বাংলাদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশের প্রথম সারির ১০টি ফুলের মধ্যে জারবেরা অন্যতম। ফুলটি বেশি দিন ফুলদানিতে সতেজ থাকে। এই ফুল চাষ লাভজনক হলেও বিভিন্ন খাতে অত্যধিক খরচ হওয়ায় চাষিরা আগ্রহ দেখান না। তবে কোনো চাষি আগ্রহ দেখালে তাঁকে সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে।