শহরের কোলাহলময় একঘেয়ে জীবন ছেড়ে একটু শান্তির খোঁজে মানুষ প্রিয়জনদের নিয়ে বেরিয়ে পড়তে চান। পছন্দের গন্তব্য নিয়ে ভাবতে থাকেন। অনেকেই পছন্দের জায়গা হিসেবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে বেছে নেন। যেখানে একসঙ্গে পাহাড়, সমুদ্র, সংস্কৃতি আর রোমাঞ্চ উপভোগ করা যায়।
কক্সবাজারের পর্যটন পরিসংখ্যান
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ‘কক্সবাজার' এখনো নিজের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। এখানে হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস, কটেজ আছে ৫৩৭টির বেশি। পাঁচ তারকা হোটেল ও রিসোর্ট আছে ১২টির বেশি। দেশের অন্য কোনো জেলায় এতসংখ্যক হোটেল, রিসোর্ট নেই। তবে এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে কক্সবাজারের হোটেল ও রিসোর্টের কক্ষ ভাড়া, রেস্তোরাঁগুলোয় খাবারের মূল্য এবং গণপরিবহনের ভাড়া অন্যান্য জেলার তুলনায় কিছুটা বেশি, লাগামহীন। তারপরও সমুদ্রের টানে প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসছেন অগণিত ভ্রমণপিপাসু। কারণ, কেবল সমুদ্র নয়, কক্সবাজারে একসঙ্গে দেখার আছে অনেক কিছু।
সমুদ্র, মেরিন ড্রাইভ ও দর্শনীয় স্থান
পর্যটনের জন্য কক্সবাজার বিখ্যাত হওয়ার অন্যতম কারণ ১২০ কিলোমিটারের নিরবচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকত। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সমুদ্রের লোনাজলে ডুবসাঁতার, দ্রুতগতির জলযান জেটস্কিতে চড়ে গভীর সাগরের নীল জলরাশিতে চক্কর মেরে আসা, স্কুবা ডাইভিংয়ের মাধ্যমে সমুদ্রতলের প্রাণিজগতের রহস্য উন্মোচন, প্যারাসেইলিংয়ে ঝুলে পাখির চোখে সমুদ্র-পাহাড়-ঝরনা, বালুচরে লাল কাঁকড়ার রাজত্ব এবং সাগরে মাছ ধরে ট্রলারের ফিরে আসার দৃশ্য—মুহূর্তেই মনকে সতেজ করে তোলে। আর বিকেলবেলায় সৈকতে দাঁড়িয়ে পশ্চিমাকাশে লাল আভা ছড়ানো সূর্যাস্ত, সন্ধ্যারাতে চেয়ারে বসে সমুদ্রের সারিবদ্ধ ঢেউয়ের আগমনী দৃশ্য উপভোগ এবং সমুদ্রের কান্না অথবা গর্জন মনকে যেমন প্রশান্তি দেয়, তেমনি প্রসারিত করে চিন্তার জগৎ।
এটা ঠিক যে কক্সবাজার ভ্রমণে আসা ৯৫ শতাংশ পর্যটকের কাছে প্রধান আকর্ষণ সমুদ্র। তারপর ৮৪ কিলোমিটারের কক্সবাজার- টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কটির পূর্ব পাশে সারিবদ্ধ উঁচু পাহাড়। আর পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগর। সাগর আর পাহাড়ের মধ্যভাগ দিয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভ না দেখে গন্তব্যে ফেরা মানে ভ্রমণ বিফল।
শাহেনশাহ গুহা, দরিয়া নগর ইকো ট্যুরিজম পার্ক, হিমছড়ির ঝরনা
শহরের কলাতলী হাঙর ভাস্কর্য মোড় থেকে যানবাহনে চড়ে সাত কিলোমিটার গেলে সামনে পড়ে ইটপাথরে নির্মিত বিশাল এক হাঙর। হাঙরের মুখ দিয়ে ঢুকে লেজ দিয়ে বেরিয়ে কিছু দূর গেলে দেখা মেলে ৪০০ বছরের পুরোনো প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ শাহেনশাহ গুহা এবং দরিয়ানগর ইকো ট্যুরিজম পার্ক। পশ্চিম পাশের দরিয়ানগর সৈকতে রয়েছে প্যারাসেইলিং। সেখান থেকে চার কিলোমিটার গেলে হিমছড়ির ঝরনা। ঝরনার শীতল জলে কিছুক্ষণ শরীর ভিজিয়ে অনেকে উঠে পড়েন হিমছড়ি পাহাড়চূড়ায়। সেখান থেকে বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রসৈকত, ঝাউবন আর মেরিন ড্রাইভকে মনে হবে পায়ের নিচে। এমন দুর্লভ দৃশ্য দেশের অন্য কোথাও দেখা মিলবে না।
ইনানী ও পাটোয়ারটেক সৈকত
সরকারি বিধিনিষেধের কারণে পর্যটকের যখন তখন প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন যাওয়া হয় না। জীবনে যাঁদের সেন্ট মার্টিন পা পড়েনি, তাঁদের জন্য রয়েছে ইনানী ও পাটোয়ারটেক সৈকত। বড় বড় চুনাপাথরের স্তূপে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে সমুদ্রের আসল রূপ উপভোগ করা যায়।
টেকনাফ, মাথিন কূপ, কুদুমগুহা ও কানারাজার গুহা
প্রকৃতির আসল রূপ দেখতে হলে যেতে হবে মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তে। টেকনাফ সৈকতে। মেরিন ড্রাইভের পূর্ব পাশে পাহাড়সারিতে দেখা মেলে একাধিক ঝরনা, বিনোদনকেন্দ্র, প্রাকৃতিক গুহা, পানের বরজ, সুপারি বাগান, শতবর্ষী মাদারট্রি গর্জনবন, লবণ উৎপাদন মাঠ ইত্যাদি। আর পশ্চিম পাশে সৈকতের বালুচরে লাল কাঁকড়ার রাজত্ব, গাঙচিলের ওড়াউড়ি, সাগরে মাছ ধরার নৌকা — ট্রলারের ছোটাছুটি, রঙিন ডিঙিনৌকার সারি, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। হাতে সময় একটু বেশি থাকলে টেকনাফ পৌর শহরটাও চক্কর মেরে আসা যায়। শহরের মধ্যভাগে টেকনাফ মডেল থানার ভেতরে রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেমকাহিনির ‘মাথিন কূপ'। কলকাতার সাহিত্যিক ও অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্যের সঙ্গে টেকনাফের মগ জমিদারকন্যা মাথিনের প্রেমকাহিনি নিয়ে কূপটি নির্মিত। সেখান থেকে পূর্ব দিকে দুই কিলোমিটার গেলে আন্তর্জাতিক নাফ নদী, নদীর ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। নদীর পাশে দেবতার পাহাড়-নেটং। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে নাফ নদী ও রাখাইন রাজ্যের সবকিছু খালি চোখে প্রত্যক্ষ করা যায়। টেকনাফের হোয়াইক্যং পাহাড়ে আছে ৩৬০ বছরের পুরোনো প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ 'কুদুমগুহা'। পাহাড়ের উল্টো দিকে (পশ্চিমে) আছে আরেকটি প্রাচীন সুড়ঙ্গ 'কানারাজার গুহা'। বনাঞ্চলঘেরা পাহাড়ের সুড়ঙ্গ কিংবা গুহা দেখতে গেলে অস্ত্রধারী বনকর্মীদের সঙ্গে যেতে হয়। কারণ, সেখানে বন্য হাতির বিচরণ বেশি।
শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন
বাংলাদেশ মানচিত্রের সর্ব দক্ষিণের শেষ বিন্দুটি হচ্ছে শাহপরীর দ্বীপ। সামুদ্রিক মাছের স্বর্গরাজ্য। সেখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় তাকালে দেখা যায় বঙ্গোপসাগরের বুকে ভাসমান আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপ সেন্ট মার্টিন, যা পর্যটকদের কাছে এক টুকরো স্বর্গ। বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুনাপাথরের প্রবালসমৃদ্ধ এই দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির গুপ্তবীজি উদ্ভিদ, তিন প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম, ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, চার প্রজাতির উভচর ও ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। এ ছাড়া রয়েছে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে স্পঞ্জ, শিল কাঁকড়া, সন্ন্যাসী শিল কাঁকড়া, লবস্টার ইত্যাদি।
মিনি বান্দরবান
টেকনাফ থেকে কক্সবাজার ফেরার পথে ইচ্ছা করলে 'মিনি বান্দরবান' দেখে যেতে পারেন। উখিয়ার রেজুসেতুর পশ্চিম পাশের গোয়ালিয়া পাহাড়ে এর অবস্থান। যাঁরা বান্দরবান দেখেননি, তাঁদের জন্য কক্সবাজারের 'মিনি বান্দরবান' রোমাঞ্চকর হতে পারে।
'রামু' যেন একটুকরা থাইল্যান্ড
কক্সবাজার শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে রাম্যভূমি রামু। সেখানে ৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভেতরে রয়েছে ১২টির বেশি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার। এ কারণে রামুকে অনেকে একখণ্ড থাইল্যান্ড বলে চেনেন। উত্তর মিঠাছড়ির পাহাড়চূড়ায় আছে গৌতম বুদ্ধের ১০০ ফুট লম্বা সিংহশয্যা মূর্তি। বলা হয় এটি দেশের সর্ববৃহৎ সিংহশয্যা মূর্তি। দুই কিলোমিটার দূরে দৃষ্টিনন্দন রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার। এর কিছুটা দক্ষিণে নজরকাড়া লালচিং ও সাদাচিং বৌদ্ধবিহার। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ছোট-বড় আরও কয়েকটি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার। দেশ ও বিদেশের পর্যটকের বৌদ্ধবিহার দেখতে ভিড় জমান। পুরাকীর্তিসমৃদ্ধ রামুতে রয়েছে অনেক প্রাচীন বৌদ্ধ নিদর্শন। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাবার বাগানটিও রামুতে অবস্থিত।
সাফারি পার্ক, মহেশখালী দ্বীপ ও সোনাদিয়া দ্বীপ
জীবজন্তুর দৌড়ঝাঁপ দেখতে হলে যেতে হবে ৬০ কিলোমিটার দূরে চকরিয়ার ডুলাহাজারায় । সেখানে আছে দেশের প্রথম সাফারি পার্ক। পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার চমৎকার জায়গা। পার্কে বাঘ, সিংহ, ভালুক, হরিণ, কুমির, হাতি, মেছো বাঘ, জিরাফ, জেব্রা, জলহস্তী, ওয়াইল্ড বিস্ট, হনুমান, বানর, বনগরু, বানর, সাপ, শজারু, বনরুই, বুনো শূকর, ময়ূর, উটপাখি, ইমু পাখিসহ ১২৩ প্রজাতির অন্তত দেড় হাজার প্রাণী রয়েছে। পার্কের অভ্যন্তরে একাধিক পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে, যেখান থেকে বন্য প্রাণীদের মুক্ত বিচরণ নিরাপদে পর্যবেক্ষণ করা যায়। হাতে সময় থাকলে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর বিআইডব্লিউটিএ ঘাট দিয়ে দ্রুতগতির জলযান স্পিডবোট কিংবা জাহাজে সাগর চ্যানেল পাড়ি দিয়ে দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীও ঘুরে আসা যায়। সেখানকার মৈনাক পর্বতচূড়ায় আছে ঐতিহাসিক আদিনাথ মন্দির। তার নিচে রাখাইন সম্প্রদায়ের পল্লি, কিছুটা দূরে গোরকঘাটায় রয়েছে রাখাইনদের প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও বসতি।
এখান থেকে যেতে পারেন মুক্তা ও শুঁটকি উৎপাদনরাজ্য সোনাদিয়া দ্বীপে। ম্যানগ্রোভ বনের (প্যারাবন) জন্য প্রসিদ্ধ নির্জন সোনাদিয়া সৈকতে সামুদ্রিক কাছিমের বিচরণ, লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ, বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় চামচঠোঁট পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে।
ঝিলংজার আইকনিক রেলস্টেশন
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কাছে ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দের পাড়ায় নির্মিত হয়েছে ঝিনুক আকৃতির দৃষ্টিনন্দন ছয়তলাবিশিষ্ট আইকনিক রেলস্টেশন। ২৯ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুটের রেলস্টেশন দেখতে প্রতিদিন অনেক মানুষ ভিড় জমান। দৈনিক ৪৬ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতার এই স্টেশন ভবনের নিচতলায় আছে টিকিট কাউন্টার, অভ্যর্থনা কক্ষ, মালামাল রাখার লকার, তথ্যকেন্দ্র, মসজিদ, শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র, এটিএম বুথ, প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জ ও পদচারী-সেতু। দ্বিতীয় তলায় শপিংমল, শিশুযত্ন কেন্দ্র, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি। তৃতীয় তলায় আছে তারকা মানের ৩৯টি হোটেল কক্ষ, চতুর্থ তলায় রেস্তোরাঁ, শিশুযত্ন কেন্দ্র, কনফারেন্স ও কনভেনশন সেন্টার ও কর্মকর্তাদের কার্যালয়। ভবনের সম্মুখভাবে আছে পানির ফোয়ারা। যাত্রীদের গমন ও বহির্গমনের জন্য রয়েছে পৃথক দুটি সড়ক ও গাড়ি রাখার পৃথক তিনটি পার্কিং।
ভবনের ভেতরে-বাইরে যাত্রীদের জন্য রাখা হয়েছে তিনটি চলন্ত সিঁড়ি। বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। ট্রেনে ওঠানামার জন্য আছে তিনটি প্ল্যাটফর্ম। ট্রেনে ঢাকা-চট্টগ্রামের পথ মাড়িয়ে যখন কক্সবাজার অঞ্চলে পৌঁছাবেন, তখন দেখা মেলে ভিন্ন আমেজ। শীতের সকালে সোনালি রোদে চিকচিক করে সারি সারি নারকেল ও সুপারি বাগান, সবুজ ফসলের মাঠ। আর পাহাড়সারির ভেতর দিয়ে ট্রেন যখন সমুদ্রের কিনারে পৌঁছে যায়, তখন মনের ক্লান্তি দূর হয়, চাঙাভাব ফিরে আসে।
তবে ১০১ কিলোমিটারের দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আইকনিক রেলস্টেশনের যে সুবিধাগুলোর কথা শুনলেন, তার সবটুকু ভোগ করতে হলে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তখন রাতের ট্রেন ধরে সকালে কক্সবাজার নেমে আইকনিক রেলস্টেশনে লাগেজ, মালামাল রেখে সারা দিন সমুদ্রসৈকত বা দর্শনীয় স্থান ঘুরে রাতের ট্রেনে আবার গন্তব্যে ফেরার সুযোগ পাওয়া যাবে।



