বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ গত দুই দশকে দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ই-কমার্স, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাতে নারীদের উপস্থিতি আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি। তবুও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমঅধিকার ও সুযোগের প্রশ্নে বাংলাদেশ এখনও কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। বরং নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং সেসব আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে চোখ খোলা তথ্য
বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল ২০২৬’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নেমে এসেছে ১৭৯তম স্থানে। এক বছর আগে অবস্থান ছিল ১৭৬তম এবং ২০২২ সালে ছিল ১৭৩তম। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ছয় ধাপ পিছিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নিচে রয়েছে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত ও তালেবানশাসিত আফগানিস্তান।
বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন শুধু আইন নয়, বরং নারীরা বাস্তবে কতটুকু অর্থনৈতিক সুযোগ পাচ্ছেন, ব্যবসা করতে পারছেন, সম্পদের মালিক হতে পারছেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা পাচ্ছেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সহায়তা করছে— এসব বিষয়ও মূল্যায়ন করে।
কেন পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ?
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে—আইনি সমতা, সহায়ক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের দুর্বলতা রয়েছে এই তিন ক্ষেত্রেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারীদের জন্য আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ৩৪.৩৮, সহায়ক কাঠামোতে ৩৪.৭৩ এবং আইন বাস্তবায়নে মাত্র ২৭.৯২। অর্থাৎ কাগজে-কলমে যেসব অধিকার রয়েছে, সেগুলোরও বড় অংশ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংক বলছে, অনেক দেশে নারী-পুরুষ সমতার আইন প্রণয়ন করা হলেও সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান, তদারকি ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় কোথায় বাংলাদেশ
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে দেশটির অবস্থান ১২৯তম। এর পর রয়েছে নেপাল (১৩০), ভুটান (১৩৯), শ্রীলঙ্কা (১৫৯) এবং পাকিস্তান (১৬৩)। বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯তম, আর সর্বশেষ স্থানে রয়েছে আফগানিস্তান।
এ অঞ্চলটির সামগ্রিক চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। যেখানে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার উন্নত দেশগুলোর গড় স্কোর ৮৮-এর কাছাকাছি, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় স্কোর ৪৫-এর ঘরে। ফলে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এই অঞ্চলে নারীদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়া যদি নারীদের পূর্ণ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অঞ্চলটি সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ হারাবে।
আইন থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন
বাংলাদেশে নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের জন্য ব্যবসা শুরু করা, ব্যাংক ঋণ পাওয়া, সম্পত্তির মালিকানা অর্জন কিংবা কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ে তোলা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় কঠিন।
বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় জামানতের অভাব। অধিকাংশ নারী নিজ নামে পর্যাপ্ত সম্পদের মালিক নন। ফলে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নারী উদ্যোক্তাদের ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করে।
অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা, মাতৃত্বকালীন সুবিধার সীমাবদ্ধতা, শিশুযত্ন কেন্দ্রের অভাব এবং সমমজুরি বাস্তবায়নের দুর্বলতাও নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা, আছে বাধাও
কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশে অনলাইন ব্যবসা ও ই-কমার্স খাতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা, হোম ডেলিভারি সেবা, হস্তশিল্প ও খাদ্যপণ্য বিক্রির মাধ্যমে হাজারো নারী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
তরুণ উদ্যোক্তা হাসিন ফেরদৌসীর ভাষায়, ডিজিটাল প্রযুক্তি নারীদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ না থাকায় অনেক উদ্যোক্তা নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর আর এগোতে পারেন না।
তিনি মনে করেন, নারীদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিতে তাদের অবদান আরও বাড়বে।
প্রবৃদ্ধির জন্য কেন জরুরি নারীর অংশগ্রহণ
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, শ্রমবাজারে নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানো গেলে অনেক দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যদি পূর্ণ সক্ষমতায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে না পারে, তাহলে জাতীয় উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, নারীদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়ানো গেলে তা সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এজন্য ব্যাংক ঋণ, আর্থিক প্রণোদনা, ডিজিটাল লেনদেন এবং উদ্যোক্তা সহায়তা সহজলভ্য করতে হবে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়
নারী অধিকারকর্মীরা মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকও। দীর্ঘদিন ধরে নারীরা বৈষম্যের শিকার হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
সাবেক নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক বলেন, নারীদের আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। নারী-পুরুষ সমতার প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তব পদক্ষেপ ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
তার মতে, বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ অনেকটাই সহজ হতো।
সামনে কী করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইন প্রণয়নের চেয়ে আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সহজ অর্থায়ন, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিশুযত্ন সুবিধা এবং সম্পত্তির অধিকারে সমতা নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া গৃহস্থালি ও পরিচর্যা-ভিত্তিক যে বিপুল শ্রম নারীরা প্রতিদিন দিয়ে থাকেন, সেটিকেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—বাংলাদেশে নারীদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন কার্যকর নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবমুখী উদ্যোগ। অন্যথায় নারীর ক্ষমতায়নের নানা সাফল্য সত্ত্বেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশ আরও পিছিয়ে পড়তে পারে।



