লক্ষ্মীপুর জেলায় ভালো মানের বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় ঈদের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মেঘনা নদীর পাড় ‘মিনি কক্সবাজারে’ পরিণত হয়েছে। রায়পুর, সদর ও রামগতি উপজেলা মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনপদ, যেখানে প্রকৃতি উদার হাতে সৌন্দর্য বিলিয়েছে।
মেঘনা পাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
রায়পুরের চরবংশীর আলতাফ মাষ্টার ঘাট, সাজু মোল্লার ঘাট, সদরের মজুচৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ও রামগতির চর আলেকজান্ডারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে উত্তাল মেঘনা নদী। সরকারি ছুটির দিন ও ঈদের ছুটিতে জেলা সদরের দালালবাজার জমিদার বাড়ি, খোয়াসাগর দিঘির পাড় ও রায়পুরের জ্বীনের মসজিদে উপচেপড়া ভীড় লক্ষ্য করা গেছে।
রায়পুর পৌরসভায় গত ৫৪ বছরেও গড়ে ওঠেনি কোনো বিনোদনকেন্দ্র। ভূমি জটিলতায় হাইকোর্টের মামলায় নির্মিত শিশুপার্কটির সব মালামাল চুরি হয়ে গেছে, গত ৫ বছর চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে পার্কটি।
প্রাকৃতিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে মেঘনা পাড়
রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার এলাকায় মেঘনার ভাঙন রোধে নির্মিত শক্ত বাঁধ এখন শুধু সুরক্ষাই দিচ্ছে না, তৈরি করেছে নতুন প্রাকৃতিক বিনোদনকেন্দ্র। বাঁধের ওপর দাঁড়ালে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি, জোয়ার–ভাটার ঢেউ কিনারে আছড়ে পড়ে। নদীর বাতাসে ভেসে আসে নির্মল প্রশান্তি।
বিকেল গড়ালে পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যাস্ত আর নদীর ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় অপার্থিব দৃশ্যপট। সোনালি আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ প্রকৃতির এই রূপ দেখতে ভিড় করছেন।
দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা
চাকরিজীবী হেলাল আহম্মেদ স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে রায়পুরের সাজু মোল্লার ঘাটে ঘুরতে এসে বলেন, জেলা শহরে ভালো বিনোদনকেন্দ্র নেই, সিনেমা হল বন্ধ। নদীর পাড়ে এসে দারুণ স্বস্তি লাগছে, প্রকৃতি মন ভরিয়ে দেয়।
গৃহবধূ খুশবু আক্তার বলেন, স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে সমুদ্রসৈকতে ঘোরার মতো আনন্দ পাচ্ছি। ট্রলারে করে দূরের চরে ঘুরে আসা রোমাঞ্চকর।
ষাটোর্ধ্ব মহসিন মিয়া নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে এসে জানান, জেলায় ভালো পার্ক নেই, তাই মেঘনা পাড়ই প্রধান বিনোদনস্থল। তবে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নত করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা উদ্বেগ
বিনোদনের আনন্দের মাঝেও শঙ্কা রয়েছে। নদীতে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া ট্রলার ও স্পিডবোটে ঘুরছেন পর্যটকেরা, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। নেয়ামত হোসেন বলেন, ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট ছিল না, যাত্রী ছিল অতিরিক্ত, কিছুটা ভয় কাজ করছিল।
ট্রলারচালক কিরন মাজি দাবি করেন, জোয়ার–ভাটা বুঝেই চলাচল করেন, জোয়ারের সময় যাত্রী তোলেন না, এখনো বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসান বলেন, চারটি উপজেলার মানুষের কাছে মেঘনা পাড় অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, ট্রলার ও স্পিডবোটে নিরাপত্তা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক সজিব হোসেন বলেন, ভাঙন রোধে সেনাবাহিনীর বাঁধে পলি জমে বেলাভূমি সৃষ্টি হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় নিয়মিত পরিচর্যা ও অসমাপ্ত বাঁধ দ্রুত শেষ করা দরকার।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশালতা, নির্মল বাতাস আর মানুষের প্রাণোচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে রায়পুর–রামগতির মেঘনা পাড় এখন দক্ষিণাঞ্চলের অনন্য ভ্রমণগন্তব্য, স্থানীয়দের কাছে আরেক কক্সবাজার।



