মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থান গবেষণায় সরকারি অনুদান: ৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সুযোগ
মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস ও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণায় উৎসাহ বাড়াতে সরকার একটি নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ মার্চ এ–সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা জারি করে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থান নিয়েও গবেষণার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই উদ্যোগে বিভিন্ন পেশার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়া হবে, যা গবেষণার বিষয় ও পরিসরের ওপর ভিত্তি করে ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
গবেষণার জন্য তিনটি ক্যাটাগরি ও আবেদনের যোগ্যতা
নির্দেশিকা অনুযায়ী, মোট তিনটি ক্যাটাগরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, স্বীকৃত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, একক ব্যক্তি, পিএইচডি গবেষক বা অভিজ্ঞ গবেষকেরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন। ক শ্রেণিতে দলীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে, যার মেয়াদ হবে এক বছর। খ শ্রেণিতে একক গবেষণায় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে, যার সময়সীমা ৯ মাস। গ শ্রেণিতে একক গবেষণার জন্য ৫ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে, যার মেয়াদ ছয় মাস।
আবেদনের যোগ্যতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের যে কেউ এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা (ন্যূনতম নবম গ্রেডে কর্মরত) গবেষণার জন্য অনুদানের আবেদন করতে পারবেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী গবেষকেরা প্রস্তাব দিতে পারবেন। যেকোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান আবেদন করতে পারবেন, তবে খ ও গ শ্রেণিতে এককভাবে যে কেউ আবেদন করতে পারবেন। তবে একই সময়ে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্থা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় গবেষণারত অবস্থায় থাকলে তিনি আবেদন করতে পারবেন না।
গবেষণার বিষয়বস্তু ও সময়সীমা
নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে গণমানুষের অংশগ্রহণ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের তালিকা যাচাই, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন, শহীদ বুদ্ধিজীবী, বধ্যভূমি ও শহীদদের নিয়ে গবেষণা করা যাবে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র, আঞ্চলিক যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান, গণহত্যা, শরণার্থী জীবন, আন্তর্জাতিক সমর্থনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণার জন্য এই অনুদান দেওয়া হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে, এর প্রেক্ষাপট, প্রত্যাশা, শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, চেতনা বাস্তবায়ন, স্মৃতি সংরক্ষণ এবং বীরত্বগাথা নিয়ে গবেষণা করা যাবে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (উন্নয়ন) আলমগীর হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি জুলাই শহীদ ও আহতদের নিয়েও কাজ করে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। তাই এ গবেষণায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে রাখা হয়েছে।"
আবেদন প্রক্রিয়া ও তহবিল ব্যবস্থাপনা
গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করা হবে প্রতিবছর ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে, এবং ৩১ অক্টোবরের মধ্যে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিতে হবে। গবেষণা প্রস্তাব যাচাই–বাছাই শেষে চূড়ান্ত করা হবে প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি তহবিল গঠন করা হবে, যা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), রাজস্ব বাজেট বা উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে পরিচালিত হবে।
গবেষণা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) আহ্বায়ক করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করবে এবং প্রস্তাব পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বাছাই করবে। তবে যেকোনো গবেষণা প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন মন্ত্রণালয়ের সচিব।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা তথ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের ইতিহাস এখনো পর্যাপ্তভাবে গবেষণায় উঠে আসেনি। এসব তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রামাণ্য গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা আশা করছেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন গবেষণা বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও প্রামাণ্য তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
নির্বাচিত গবেষকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গবেষণা শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে, এবং গবেষণার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে মন্ত্রণালয়। গবেষণার ফলাফল বই, প্রতিবেদন বা অন্যান্য মাধ্যমে প্রকাশ করে সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা আছে সরকারের। প্রতিবছর কতজনকে অনুদান দেওয়া হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি এবং বাজেট পাওয়ার ভিত্তিতে এটি নির্ধারণ হবে বলে জানানো হয়েছে।



