অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
যোগাযোগ
যোগাযোগ একটা ভাষা, তার বর্ণমালা বহুবিধ। আমার সাথে আমার তবুও কোনো যোগাযোগ হয় না। আমার এবং আমার অর্থাৎ আমাদের সকল বর্ণমালা হয়তো তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে!
তবু ধরো, বহুদিন পরে যদি দেখা হয় আমাদের, যোগাযোগ সক্ষমতা থাকবে কি সেই দেখা হওয়ার? আমরা কি বধির অক্ষমতায় যার যার গলিপথে হারিয়ে যাব? নাকি দেখা হওয়া নিজেই একটা ভাষা; নিজেই পদাধিকারবলে একটা যোগাযোগ!
হয়তো, হয়তো নয়। একদিন আমার সাথে আমার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা জিইয়ে রাখে ঘুঘু পাখির গান! কোথাও ঘুঘু পাখি নিয়ে আলোচনা হয়! কোথাও ঘুঘুর জন্য কেউ বন্দুক সাজায়! মাছেরা ঘাই দেয়, পুকুরে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে মহাকালের সূক্ষ্মতম অ্যাকুয়ারিয়ামে গিয়ে লাগে পাতার সংগীতের মতো।
আমার সাথে আমার কোনো পথের বাঁকে দেখা হয়! কোনো যোগাযোগ তৈরি হয় না। আমার সাথে আমার যোগাযোগ হয়, দেখা হয় না... আমরা পর ও অপরের মধ্যে পরম হয়ে উঠি। দৃশ্য ও দৃশ্য মিলে অদৃশ্যের অবতারণা করি! আমরা আমাদের অবতারণা করি অবতল ধরে অন্তর্নিহিত অর্থের ইশারা সাজাই! বিস্ময়করভাবে আমরা আমাদের দেখা হওয়ার ধোঁকাগুলোকে বিশ্বাস করি! তখন পানশালায় যোগাযোগের পানীয় চুইয়ে পড়ে। আমরা তখনো জানি যোগাযোগের বর্ণমালা বহুবিধ, বহুধাবিভক্ত...
পুকুরপাড়
গাড়িতে ফিরতে ফিরতে হঠাৎ তন্দ্রার মতো পড়ি সেই অসাবধানতার মুহূর্তে। আমি পাড় হয়ে যাই পুকুরপাড়। অথচ আমার নামার কথা ছিল পুকুরপাড়। পৃথিবীতে এই একটা স্টেশন ছাড়া আমি আর কিছু চিনি না। আমার আর কোনো গন্তব্য নেই।
সমস্ত শক্তি কণ্ঠে জড়ো করে আমি ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলি। ড্রাইভার আমাকে ভ্রুক্ষেপ করে না। তাচ্ছিল্য নিয়ে বলে, সামনের স্টেশনে নামেন। আমার সামনে আর কোনো স্টেশন নেই!!
রংরুট
আমি আবার বহুদূর যেতে চাই রংরুটে। রংরুটের শেষে বিচ্ছেদ অনিবার্য জেনেও তাকে ভালোবাসি। ভালোবাসি প্রতি মুহূর্তের আলিঙ্গন। রংরুটে গাড়ি চালিয়ে বহুদূর, তারপর নদীনালা সমুদ্র। কোনো ব্রিজ নেই। সংযোগহীন সময়ের ধু ধু দিগন্ত। সেই সময়ের ধোঁকায় থাকে শুধু না-থাকার চিহ্নসমাহার। আত্মবিভ্রমজাত মেঘের বাহার!!
নিরুদ্দেশ
আমাদের গ্রাম থেকে প্রায়ই দু–চারজন করে মানুষ নিরুদ্দেশ হয়। সেই থেকে মুখে মুখে গ্রামের নাম হয়ে গেছে ‘নিরুদ্দেশের গ্রাম’। কেউ নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে সবাই আমার কাছে ছুটে আসে। মাঝেমধ্যে খবরের কাগজের লোকও আসে। কোথায় বাড়ি ছিল? কেন নিরুদ্দেশ হলো? খুব বেশি বোহেমিয়ান ছিল কি না?
আমি তাদের কিছুই বলি না। অতীতের অনেক দূর থেকে তাদের দিকে নির্বিকার তাকিয়ে থাকি। তারা জানে না, বহু আগে এই গ্রাম থেকে প্রথম নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া মানুষটিই আমি!
লিখি
একটা এলোমেলো কবিতা যার কোনো অক্ষর নেই, শব্দ নেই, নেই কোনো বাক্য ও বাগ্বিধি। বুক ভরা মর্মর নেই, নেই পাতার সাথে পাতার গুঞ্জন। ফুলগুলো ভ্রমর ও প্রজাপতি নেই। লিখি কোনো কথা বলে না সেই কবিতা। তোমাকে ডাকে না, তোমার জন্য মন খারাপ করে ডিপ্রেশনে যায় না।
যে কবিতার শরীর ভরা থাকে উষ্ণতা, কোনো থার্মোমিটার যে তাপ মাপতে পারে না। যে কবিতার কোনো একটা গ্রাম অথবা শহরে বহু বছর বৃষ্টি হয় না। সেখানে খেত ফেটে চৌচির, খরতাপে জ্বলে যায় পিচ!
এমন একটা এলোমেলো কবিতা যার অক্ষর নেই, বাক্য নেই, কোনো ধরনের অভিব্যক্তি নেই। পাতার সাথে পাতার দেখা হয় না। চারপাশে লু হাওয়া, লু চাহনি, লু অক্ষরের তেজস্ক্রিয়তা। এমন একটি কবিতা যার কোনো শব্দ নেই, শব্দার্থ নেই, নেই কোনো সারাংশ। এলোমেলো মেলো, এলোকবিতা। আমাকেই আমি প্রতিনিয়ত লিখি।



