জন ডিউয়ি বিশ শতকের আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা দার্শনিক হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর মতো পণ্ডিত বিশ শতকের আমেরিকায় জন্ম গ্রহণ করেননি। সত্তর বছর ধরে তিনি শিক্ষা, দর্শন, মনোবিজ্ঞান, রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে যা লিখেছেন, তা ৩৭টি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর লেখা নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা চলছে, এবং এখনও বহু পণ্ডিত ব্যক্তি তা নিয়ে কাজ করছেন।
জন ডিউয়ির শিক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ
শিক্ষার ওপর তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হলো: দ্য স্কুল অ্যান্ড সোসাইটি, দ্য চাইল্ড অ্যান্ড কারিকুলাম, হাউ উই থিঙ্ক, ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড এডুকেশন, দ্য পাবলিক অ্যান্ড ইটস প্রবলেম, এবং এক্সপেরিয়েন্স অ্যান্ড এডুকেশন। তিনি গণতন্ত্রের একজন উচ্চকণ্ঠ দার্শনিক ছিলেন।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশে আজ শিক্ষা নিয়ে এক বিভ্রান্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সেটা লক্ষ্য করেই জন ডিউয়ির কথা মনে পড়লো। অবশ্য আজকের এই ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বর্তমান সরকারই দায়ী, একথা বলা যাবে না। তবে শিক্ষাব্যবস্থার এই ভগ্ন দশা থেকে উত্তরণের জন্য যেসব উপায় বা কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে, তা কেবল হাস্যকরই নয়, বরং কার্যকর করাও সম্ভব নয়। আর কার্যকর করা গেলেও শিক্ষার ডুবে যাওয়া জাহাজটি তোলা যাবে না। কারণ আমাদের বড়দের মাথার মধ্যে স্কুল, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সম্পর্কে এক ভুল ধারণা পাথরের মতো জমাট বেঁধে বসে আছে। সেজন্যই আমার বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আমেরিকান শিক্ষা দার্শনিক জন ডিউয়ির কথা মনে পড়ে গেল।
শিল্পায়নের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার পরিবর্তন
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ এবং উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমে কৃষিভিত্তিক আমেরিকা দ্রুত শিল্পায়নের পথে এগোতে থাকে। আগে শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব পালন করতো পরিবার ও চার্চ। কিন্তু তখন পরিবার ও চার্চের পক্ষে সে দায়িত্ব পালন ক্রমশই হ্রাস পেতে থাকে, এবং বাড়তে থাকে স্কুলের দায়িত্ব। স্কুল কর্তৃপক্ষের শিক্ষার দর্শন কেমন ছিল, তা সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন জন ডিউয়ি। তিনি বলেন, আমাদের স্কুলগুলো কোনো ফ্যাক্টরি বা ইন্ডাস্ট্রি নয়। ছাত্ররা নিষ্ক্রিয় কাঁচামাল নয় যে, স্কুলের ছাঁচে ঢেলে আমরা দক্ষ ফিনিশড প্রোডাক্ট তৈরি করি। গণতন্ত্রের আপসহীন দার্শনিক জন ডিউয়ি তাঁর সমসাময়িক স্কুলগুলোর এই অবস্থা দেখেছিলেন এবং বিষয়টিকে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড এডুকেশন গ্রন্থে।
বর্তমান সরকারের শিক্ষানীতি নিয়ে প্রশ্ন
বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচিত বর্তমান সরকার শিক্ষা নিয়ে কী করতে চলেছে, তা ঠিক বোধগম্য নয়। তারাও কি কুমোরের মতো শিশুদের আঠাল মাটির ঢেলা মনে করছেন? যা খুশি তাই বানাবেন?
পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী শিক্ষা আন্দোলন
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এদেশের শিক্ষা সাম্প্রদায়িকতার পথে যাত্রা শুরু করে। ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল একটি স্বায়ত্তশাসিত গণতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলন। ১৯৬৯ সালের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফায় তা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু পরিষ্কারভাবে আইয়ুব খানকে বলেছিলেন যে, ছয় দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার ভিত্তিতে দেশের সংবিধান রচিত হবে। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার সেই লক্ষ্যে ড. কুদরত-এ-খুদার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। কমিশন দ্রুত তার রিপোর্ট পেশ করে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে কুদরত-এ-খুদার রিপোর্ট ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। তারপর আর ওই রকম পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়নি। জোড়াতালি দিয়ে শিক্ষার গাড়িটিকে সচল রাখা হয়েছে। খুদা কমিশনের সুপারিশ ছিল স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত একটি শিক্ষাব্যবস্থা। পরিবর্তে গত ৫৪ বছরে গড়ে উঠেছে একটি সরকার নিয়ন্ত্রিত আমলাতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা।
জন ডিউয়ির দর্শন ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
জন ডিউয়ি ঠিক এই রকম শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন এবং একটি স্বায়ত্তশাসিত গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছিলেন। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা স্বায়ত্তশাসনহীন আমলাতান্ত্রিকতার কঠিন শৃঙ্খলে বাঁধা। এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত না হলে এদেশের শিক্ষা আর কখনও সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারবে না।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



