বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়নের মৌসুম এলেই একটি পরিচিত দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা সামনে রেখে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতি বছর রাজস্ব আহরণের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এরপর শুরু হয় সেই লক্ষ্য অর্জনের লড়াই। তবে অর্থবছর শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত অর্জনের মধ্যে রয়ে গেছে বড় ধরনের ব্যবধান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য এটি যেন এক দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরও এ ধারার ব্যতিক্রম নয়। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে গতি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা, শিল্প উৎপাদনের মন্থর প্রবৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরাজমান অনিশ্চয়তার কারণে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে এনবিআরের নিজস্ব প্রশাসনিক দুর্বলতা, কর ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার ধীরগতি। ফলে অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তুতি চলছে, যা হবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং করবহির্ভূত রাজস্ব (এনটিআর) থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আহরণের এই লক্ষ্য বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
তবে বাস্তবতা হলো, গত কয়েক বছর ধরেই এনবিআর ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতা, আমদানি কমে যাওয়া, শিল্প উৎপাদনে ধীরগতি এবং করভিত্তি সম্প্রসারণে সীমিত অগ্রগতির কারণে রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এ কারণে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নতুন বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলে সরকারকে আরও বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
আয় বাড়ছে না, ব্যয় বাড়ছে
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সরকারের ব্যয় দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে রাজস্ব আয় বাড়ছে না। নতুন সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। কিন্তু সরকারের প্রধান আয় উৎস কর রাজস্ব। আর সেখানেই রয়েছে বড় সংকট।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি নেমে আসে মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশে, যা দেশের অর্থনীতির আকার ও উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার তুলনায় অত্যন্ত কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর-জিডিপি অনুপাত অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত না হলে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি টেকসইভাবে পরিচালনা করা কঠিন হবে।
লক্ষ্য নির্ধারণে বাস্তবতার ঘাটতি
গত এক দশকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতি বছরই এনবিআর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল প্রায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। শুরুতে অবশ্য সরকারের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা আদায়। পরে বাস্তবতা বিবেচনায় সেটি কমিয়ে আনা হয়। কিন্তু সংশোধিত লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সমস্যার মূল কারণ কেবল রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতা নয়; বরং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পদ্ধতিতেই রয়েছে বড় ধরনের ত্রুটি। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং করদাতার সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে প্রায়ই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রত্যাশার ভিত্তিতে রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে শুরু থেকেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
চাপের মুখে করদাতা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে বছরের মাঝামাঝি সময়ে কর প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। সেই চাপ অনেক ক্ষেত্রে গিয়ে পড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নিয়মিত করদাতাদের ওপর। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, নতুন কর আরোপ, ভ্যাট বৃদ্ধি, উৎসে কর সম্প্রসারণ কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক হয়রানির মাধ্যমে রাজস্ব ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হয়। এতে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যায়।
অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, কর আহরণের পরিবর্তে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি কমানো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়নই হওয়া উচিত রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান কৌশল। কিন্তু বাস্তবে এখনও বড় অংশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।
সংস্কারের পথ কেন থমকে গেল?
দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, কর নীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসনকে পৃথক করা প্রয়োজন। একই প্রতিষ্ঠানের হাতে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকায় জবাবদিহিতা এবং দক্ষতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে এই সংস্কার কার্যক্রম পরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রশাসনিক আপত্তির মুখে স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সরকার বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এনবিআর সংস্কার ছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। কারণ বর্তমান কাঠামোতে কর প্রশাসন আধুনিক অর্থনীতির চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়।
অর্থমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর নীতি নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা জরুরি। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে কর প্রশাসনের মধ্যে এমন একটি মানসিকতা গড়ে উঠেছে যেখানে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিলেই নতুন করে কোথাও কর বাড়ানো বা অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার চিন্তা করা হয়। কিন্তু শুধুমাত্র করের হার বাড়িয়ে বা নতুন কর আরোপ করে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন কর ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে অনেকেই বিদ্যমান কর কাঠামোর সীমাবদ্ধতার একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
আগামী অর্থবছরে সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও পুরোপুরি কমেনি। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও ঋণের উচ্চ সুদহার ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। চতুর্থত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রপ্তানি বাজারের প্রতিযোগিতা রাজস্ব প্রবৃদ্ধিকে সীমিত করতে পারে। এই বাস্তবতায় অত্যধিক উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলে বছরের শেষে আবারও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
পুরোনো চক্র ভাঙার সময়
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত রাজস্ব ঘাটতি নয়, বরং ঘাটতিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি। প্রতি বছর বড় বাজেট ঘোষণা করা হয়, বড় রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, তারপর সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এভাবে বছরের পর বছর ধরে একই চক্র চলতে থাকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর নীতিতে স্বচ্ছতা, করদাতাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং কর নেট সম্প্রসারণ। সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ একটি দক্ষ, আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে। অন্যথায় প্রতিবছরের মতো আগামী বছরও নতুন একটি উচ্চাভিলাষী সংখ্যা ঘোষণা করা হবে, আর অর্থবছর শেষে সেই সংখ্যার সঙ্গে বাস্তব অর্জনের ব্যবধান নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হবে।



