বিএনপি সরকারের দুই মাসে ৬০টি জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা
বিএনপি সরকারের দুই মাসে ৬০টি জনকল্যাণ পদক্ষেপ ঘোষণা

বিএনপি সরকারের দুই মাসে ৬০টি জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই মাস পূর্ণ হয়েছে গত শুক্রবার। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দলটি নির্বাচনের আগে দেওয়া একাধিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে প্রশংসা কুড়াচ্ছে। মাত্র দু’মাসে জনকল্যাণে ৬০টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

শনিবার বিকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এসব পদক্ষেপের কথা বিস্তারিতভাবে জানানো হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দু’মাস মেয়াদ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। ‘সরকারের দুই মাসে প্রধানমন্ত্রীর ৬০টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ এক অবিস্মরণীয় অর্জন’ শীর্ষক এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বক্তব্য রাখেন।

মুখপাত্রের বক্তব্য

মাহদী আমিন বলেন, “তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের শপথ গ্রহণের দু’মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল। বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অধ্যায় অতিক্রম করে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমান দৃঢ় ও সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্ব রাজনীতির জন্যও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি আরও যোগ করেন, “গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অর্জিত নিরঙ্কুশ বিজয়কে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকরা গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দু’মাসের মধ্যেই সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, তা দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।”

৬০টি পদক্ষেপের উল্লেখযোগ্য দিক

সরকারের ৬০টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  1. নারীর ক্ষমতায়ন: প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি পরিবারের কাছে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পাইলট প্রকল্প শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে।
  2. কৃষক কার্ড: প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দেশের কৃষক-কৃষাণীর জন্য ১০টি সুবিধা ও নগদ অর্থায়ন সম্বলিত ‘কৃষক কার্ড’ প্রচলন করা। ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলার ২২ হাজারেরও বেশি প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষককে এই কার্ড দেওয়া হয়েছে।
  3. কৃষক ঋণ মওকুফ: প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
  4. অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও দেশের আইনি কাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষায়, অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সরকার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
  5. নদী-খাল খনন: সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল এবং জলাশয় খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫৪ জেলায় এই কাজ শুরু করা হয়েছে।
  6. জ্বালানি দাম নিয়ন্ত্রণ: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও সরকার জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
  7. সৌরশক্তি সম্প্রসারণ: জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সোলার বা সৌরশক্তি ব্যবহার করে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
  8. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ: সরকারের একটি অগ্রাধিকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা। প্রতিকূল বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে পবিত্র রমজান মাসে এবং এখনও অন্যান্য বছরের তুলনায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
  9. ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মানি: চার হাজার ৯০৮টি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, ৯৯০টি মন্দিরের পুরোহিত, ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ এবং ৩৯৬টি গির্জার যাজক ও পালকরা মাসিক সম্মানি পাচ্ছেন। এই কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে সব মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে বাস্তবায়ন করা হবে।
  10. প্রবাসী কার্ড: শিগগিরই প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন

সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অধিকতর শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একগুচ্ছ বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তর। এ লক্ষ্য অর্জনে খাতভিত্তিক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা, পুনর্গঠন ও বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে নিতে পাঁচ বছর মেয়াদী কৌশলগত কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনা, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো ও এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালুর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে:

  • প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী ক্ষমতায়নকে প্রাধান্য দিয়ে মোট কর্মীর ৮০ শতাংশই নারী থেকে নেওয়া হবে।
  • সঠিক ও গুণগত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
  • প্রতি বছর পুনরায় ভর্তি ফি বাতিল, অর্থাৎ পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হবার পর নতুন করে আর ভর্তি ফি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
  • লটারির পরিবর্তে আধুনিক ভর্তি পরীক্ষা বা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের ভর্তি, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
  • সকল স্তরের শিক্ষাবৃত্তির অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হয়েছে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

সরকারের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে:

  • বিদ্যুৎ ও অর্থ অপচয় রোধে রাষ্ট্রীয় ইফতার সীমিত করা হয়েছিল। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সব ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ১১ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
  • দালালদের হস্তক্ষেপ বন্ধের লক্ষ্যে নামজারি ও সেবাগ্রহীতাদের অনলাইন আবেদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নগদ টাকা লেনদেনের সুযোগ বন্ধ করতে অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
  • এমপি-মন্ত্রীদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমছে।
  • বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। সরকারের লক্ষ্য একটি উদার ও গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে কোনো মত, বিশ্বাস বা পরিচয় অবমূল্যায়িত হবে না। মুক্ত ও নিরাপদ মতপ্রকাশ, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং বাধাহীন চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে গত দুই মাসে এর কোনও ব্যত্যয় ঘটেনি।

মাহদী আমিন তার বক্তব্যে আরও বলেন, “গতকাল বর্তমান সরকারের মেয়াদ দু’মাস পূর্ণ হয়েছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সরকার নির্বাচনের আগে ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার দুর্বার গতিতে অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে। প্রতিটি সেক্টরে এবং গণমানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ১৮০ দিনের যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা এক অবিস্মরণীয় অর্জন।”

সরকারের এই ৬০টি পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।