পয়লা বৈশাখ বাঙালির কাছে শুধু একটি তারিখ নয়—এটি বাঁচার আনন্দ, একসঙ্গে থাকার উৎসব এবং শিকড়ের সঙ্গে প্রতিবছর নতুন করে পরিচয়ের দিন। সারা দেশের মতো নীলফামারীর সৈয়দপুরেও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপিত হয়েছে গভীর আনন্দ ও মর্যাদার সঙ্গে। ১১৫ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘শিল্প সাহিত্য সংসদ’ এবং সৈয়দপুর বন্ধুসভার যৌথ আয়োজনে দিনটি হয়ে উঠেছিল সত্যিকারের স্মরণীয়।
বন্ধুসভার নেতৃত্বে নতুন মাত্রা
বন্ধুসভার সভাপতি মমতাজ পারভীনের নেতৃত্বে সংগঠনটি এবারের উৎসবে এনেছে নতুন মাত্রা ও নতুন উদ্দীপনা। ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত শিল্প সাহিত্য সংসদের আয়োজনে ১৪ এপ্রিল সকাল সাড়ে আটটায় উপজেলার শহীদ স্মৃতি পার্ক থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। নিজস্ব ব্যানার হাতে বন্ধুসভার বন্ধুরাও মিলে যান এই মিছিলে। রোলার স্কেটিংয়ের ঝলক, বাহারি সাজসজ্জা আর বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির সুর মিলিয়ে পুরো শহর মুখর হয়ে ওঠে উৎসবের আমেজে। প্রভাতী এই অনুষ্ঠান সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেন বন্ধুসভার উপদেষ্টা এম আর আলম।
মেলায় বর্ণিল আয়োজন
শহীদ স্মৃতি পার্কের মেলায় নানা সংগঠন ও উদ্যোক্তাদের স্টল ছিল চোখে পড়ার মতো। হাতে তৈরি কারুপণ্য, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবার আর পান্তা-ইলিশের সুঘ্রাণে ভরপুর ছিল মেলার পরিবেশ। এবারের মেলায় বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছে স্ন্যাকস আইটেমের মিক্সড ফুড স্টলটি, যেটি পুরস্কারও জিতে নেয়। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন কেয়া সুলতানা, যা উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ছাড়া বন্ধুসভার উদ্যোগে পরিচালিত বিনা মূল্যের স্বাস্থ্যসেবা স্টলটিও ছিল মেলার অন্যতম আকর্ষণ, যেখানে দর্শনার্থীরা বিনা খরচে রক্তচাপ ও ওজন মাপাতে পেরেছেন। অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়।
সাংস্কৃতিক পর্বের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা
বেলা দুইটায় শুরু হয় বন্ধুসভার সাংস্কৃতিক পর্ব। পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন শিক্ষক বেন তুন সান ও বিনু। তাঁদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি পায় ভিন্নমাত্রার প্রাণ। কোরাস গানে শুরু হওয়া সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় নুসরাত জাহান নিছা কবিতায় তুলে ধরেন বাঙালির দ্রোহ ও প্রেমের কথা। একক সংগীতে দর্শকদের মুগ্ধ করেন তাপস রায়, দিপ্তী সিং, মিতৌশী রায় সৃষ্টি ও ফাতেমা।
‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ পর্বের বিশেষ আকর্ষণ
‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ পর্বটি ছিল অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ। এতে অংশ নেন দিপ্তী সিং, গুঞ্জন, রাফিন ও সকাল। তাঁদের সৃজনশীল সাজসজ্জা ও উপস্থাপনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং অনুষ্ঠানে যোগ করে প্রাণোচ্ছল এক বিশেষ মুহূর্ত। নৃত্য পরিবেশনায় মঞ্চ কাঁপান সাধন চন্দ্র দাস, ঊর্মি, ফাতেমা ও মিতৌশী রায় সৃষ্টি। তাঁদের দলীয় নৃত্যের পাশাপাশি সাধন চন্দ্র দাসের একক নৃত্যও দর্শকের বিশেষ প্রশংসা পায়।
সম্প্রীতির মিলনমেলা
সৈয়দপুরের ১৪টির বেশি সংগঠনের অংশগ্রহণে এই উৎসব হয়ে ওঠে সম্প্রীতির এক মিলনমেলা। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে প্রবীণ ও তরুণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সৈয়দপুরের পয়লা বৈশাখ এবার নিজেকে ছাড়িয়ে গেছে। নববর্ষের এই আনন্দ ও উদ্দীপনা যেন বছরজুড়ে বাঙালির মনে অম্লান থাকে—এই প্রত্যাশা নিয়েই শেষ হয় এই বর্ণিল উৎসব।



