মঙ্গল না আনন্দ? পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে চলমান বিতর্ক
বৈশাখ মানেই শোভাযাত্রা, জরাজীর্ণতা দূর করে এগিয়ে যাওয়া ও মঙ্গল কামনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রতীক। নতুন বছরের আগমনী আনন্দে ভরা এই যাত্রা নিয়ে এবার নামকরণ নিয়ে টানাটানি তীব্র আকার ধারণ করেছে। এমনকি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঈমান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় এবার পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠিত মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।
হাইকোর্টে রিট ও সরকারের নতুন নামকরণ
রবিবার (৫ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান (মামুন) জনস্বার্থে এই রিট দায়ের করেন। মজার ব্যাপার হলো, এই একই দিনে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ঘোষণা দিলেন যে, পহেলা বৈশাখের দিন বাংলা নববর্ষ বরণের শোভাযাত্রা এবার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণা নাম পরিবর্তনের দীর্ঘ বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মঙ্গলে কী অসুবিধা? জিনাত আরা হকের প্রশ্ন
মঙ্গল শোভাযাত্রা নামকরণ নিয়ে আমরাই পারি জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রা হলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করা। এখন ওই ব্যাপারটাকেই যদি সমস্যা মনে করেন— তাহলে এটা সমস্যা। যখন আমরা সাম্প্রদায়িকতার কথা বলি তখন এর বড় জায়গাজুড়ে থাকে মৌলবাদ— যা বৈচিত্র্য পছন্দ করে না। ফলে নানারকম শব্দ বদল করা হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “গত বছর আমরা দেখেছি শোভাযাত্রাগুলো জোর করে বৈচিত্র্য আনার কথা বলে একধরনের মেকি উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চেষ্টা করেছে। এখন সরকারের চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে জাতিসত্তা হিসেবে বাঙালি বাংলাদেশির কী রূপ হবে— সেটা নিয়ে স্পষ্ট কথা বলা। মঙ্গলে অমঙ্গল দূর হয়, নতুন বছরে মঙ্গলের সূচনা হোক— এসব আকাঙ্ক্ষা থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল। এখন নাম বদল যারা সময়ে সময়ে করতে চেয়েছেন তারা শোভাযাত্রা শুরুর কারণটা কী— হয় সেটা ধরতে চাইছেন না বা ধরতে পারছেন বলেই বদলাতে চাইছেন।”
অধিকারকর্মী খুশি কবীরের বিশ্লেষণ
কেন বারবার পরিবর্তনের কথা আসে এই প্রশ্নে অধিকারকর্মী খুশি কবীর বলেন, “যারা বারবার পরিবর্তন করতে চায় কারণটা তারা জানেন। আমরা এই শোভাযাত্রাকে মঙ্গল বলেই জানি। আমি মনে করি পরিবর্তনের এই আকাঙ্ক্ষা অনিরাপত্তা থেকে তৈরি। এই ধরনের অনিরাপত্তা বোধে যারা ভোগেন তারা পরিবর্তন করতে চান। যদিও বর্তমান সরকার যে ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছেন সেখানে এই ধরনের অনিরাপত্তায় ভোগার করার কোনও কারণ নেই। এটা ভালো লক্ষণ না।”
সংস্কৃতিমন্ত্রীর স্পষ্ট ব্যাখ্যা
নাম পরিবর্তন নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমি যেটা বলেছি সেটা হলো— যা আনন্দ তাই মঙ্গল। এ নিয়ে বিতর্কটা কেন? কেউ আছে একদম আঁকড়ে ধরেছে যে— না ‘মঙ্গলই’ হতে হবে, কেউ বলছে ‘আনন্দই’ থাকতে হবে। রবীন্দ্রনাথের গানেও আছে— ‘আনন্দালোকে মঙ্গলালোকে’। আসলে আনন্দ আর মঙ্গলের অর্থ আগে বুঝতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “পহেলা বৈশাখে আমাদের দেশের মানুষ ও কৃষক সমাজ আনন্দে ভেসে যায়। এই আনন্দের মধ্যেই আমরা মঙ্গল খুঁজি। আমরা কৃষক সমাজেরই উত্তরসূরি। এই নাম নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, আমরা তার অবসান ঘটাতে চাই।”
শোভাযাত্রার ইতিহাস ও ইউনেস্কো স্বীকৃতি
মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস প্রায় সাড়ে তিন দশকের। ১৯৮৯ সালে যাত্রা শুরুর সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের আয়োজনটির নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। পরের বছর থেকে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত হয়। ২০১৬ সালে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ’ শিরোনামে অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে এই শোভাযাত্রাটি ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত হয়। ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর মঙ্গল শোভাযাত্রা নতুন মাত্রা পায়।
গত বছরের ১১ এপ্রিল শোভাযাত্রাটির আয়োজন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ সম্মেলনে এর নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করার সিদ্ধান্ত জানায়। শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়।
ছায়ানটের নিরপেক্ষ অবস্থান
এদিকে ডা. সারোয়ার আলী এই বিতর্কের প্রশ্নে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা ছায়ানট থেকে কোনও মন্তব্য করছি না। শোভাযাত্রা হলেই আমরা খুশি।” এই মন্তব্য বিতর্কের প্রেক্ষাপটে একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
সার্বিকভাবে, পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নামকরণ নিয়ে বিতর্ক শুধু একটি শব্দের পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও ঐতিহ্য রক্ষার জটিল প্রসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাইকোর্টে রিট, সরকারের নতুন নামকরণ এবং বিভিন্ন মহলের মতামত এই বিতর্ককে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করে তুলছে।



