মিরসরাইয়ে হরিণ জবাই: বন্য প্রাণী সংরক্ষণে চরম ব্যর্থতা ও টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন
মিরসরাইয়ে হরিণ জবাই: বন্য প্রাণী সংরক্ষণে ব্যর্থতা

মিরসরাইয়ে হরিণ জবাই: বন্য প্রাণী সংরক্ষণে চরম ব্যর্থতার চিত্র

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় এক মায়াবী চিত্রা হরিণকে প্রকাশ্যে দা দিয়ে কুপিয়ে জবাই করা হচ্ছে। মাত্র ছয় সেকেন্ডের এই ভিডিওটি কেবল একশ্রেণির মানুষের নিষ্ঠুরতাই তুলে ধরে না, বরং আমাদের দেশের সামগ্রিক বন ও বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতার দিকটিও স্পষ্ট করে তোলে।

ঘটনার বিস্তারিত ও প্রেক্ষাপট

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ এপ্রিল চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ইছাখালী ইউনিয়নের মুহুরী প্রকল্প এলাকায় জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশে এ হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। প্রকাশ্যে এ ধরনের অমানবিক কাজ যারা করতে পারে, তারা যে দেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনের ন্যূনতম তোয়াক্কা করে না, তা এখন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তবে হরিণ জবাইয়ের এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এর পেছনের প্রেক্ষাপট আরও বেশি উদ্বেগজনক। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্যানুসারে, মিরসরাইয়ের ওই উপকূলীয় অঞ্চলে একসময় অন্তত ২০ কিলোমিটারজুড়ে ঘন ম্যানগ্রোভ বন বা বাদাবন ছিল। হাজারো হরিণ, মেছো বাঘ, শিয়ালসহ অজস্র প্রজাতির পশুপাখির অবাধ বিচরণস্থল ছিল এই বনাঞ্চল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বন উজাড় ও বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস

কিন্তু সেখানে ‘জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যাপকভাবে বন উজাড় হতে থাকে। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শিল্পায়ন সবারই কাম্য। তবে একটি গোটা বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে এবং বন্য প্রাণীদের চিরতরে উচ্ছেদ করে যে ‘উন্নয়ন’ করা হয়, তা কোনোভাবেই টেকসই হতে পারে না।

আবাসস্থল ও প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস নষ্ট হওয়ায় প্রাণীরা এখন আশ্রয়ের খোঁজে দিগ্ভ্রান্ত হয়ে প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। আর প্রাণীদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে নিষ্ঠুর কিছু মানুষ। বন্য প্রাণীদের চরম নিরাপত্তাহীনতা আমাদের বন বিভাগের নজরদারির প্রকট অভাবকেই সামনে আনে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বন বিভাগের দায়িত্বহীনতা ও প্রশ্ন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ও মানুষের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের পরই কেবল বন বিভাগের টনক নড়তে দেখা গেল। আমাদের প্রশ্ন হলো, ওই বিশাল এলাকায় অবশিষ্ট বন্য প্রাণীদের সার্বক্ষণিক তদারকি ও সুরক্ষায় আগে থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন?

আইন প্রয়োগ ও টেকসই সমাধান

প্রকৃতি ও প্রাণী ধ্বংসের এই উন্মত্ততা রুখতে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২ অনুযায়ী বন্য প্রাণী শিকার বা হত্যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অবিলম্বে হরিণ হত্যার ঘটনায় চিহ্নিত দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সেই সঙ্গে শিল্পের সম্প্রসারণের পাশাপাশি অবশিষ্ট বন্য প্রাণীগুলোর জন্য অবিলম্বে বিকল্প নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা বা অভয়ারণ্য গড়ে তোলা অপরিহার্য। শিল্পায়ন হোক, তবে তা যেন বন্য প্রাণীর রক্ত ও অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদের বিনিময়ে না হয়। প্রাণবৈচিত্র্য টিকে না থাকলে সভ্যতার বিকাশও যে স্থবির হয়ে পড়বে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই সত্য অনুধাবন করতে হবে।