এআই ভয়েস ক্লোনিং প্রতারণা: ক্যালিফোর্নিয়ার মা হারালেন হাজার ডলার
এআই ভয়েস ক্লোনিং: ক্যালিফোর্নিয়ার মা হারালেন হাজার ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এক মা চলতি মাসে একটি ফোন কল পান, যেখানে তার মেয়ের কান্নাকাটি ও বিপদে পড়ার কথা শোনা যায়। তিনি কয়েক হাজার ডলার পাঠিয়ে দেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন, এটি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি একটি নকল কণ্ঠস্বর ছিল। তিনি একা নন; বর্তমানে 'ভয়েস ক্লোনিং' বা কণ্ঠ নকল করার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেকেই।

কীভাবে কাজ করে এআই ভয়েস স্ক্যাম?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা পূর্ববর্তী প্রতারণামূলক ফোন কল থেকে গোপনে রেকর্ড করা সামান্য অডিও ব্যবহার করেই প্রতারকরা যে কারও কণ্ঠের এআই রেপ্লিকা তৈরি করে ফেলে। এরপর তারা ভুক্তভোগীর কোনো প্রিয়জন সেজে ফোন করে দাবি করে যে সে অপহরণের শিকার হয়েছে বা জেলে আছে এবং তাকে মুক্ত করতে জরুরি ভিত্তিতে টাকা পাঠাতে হবে।

ফিলাডেলফিয়ার আইনজীবী গ্যারি শিল্ডহর্ন তার ছেলের কণ্ঠ নকল করা এমন এক স্ক্যামের শিকার হন। তিনি বলেন, 'তখন চিন্তা করার কোনো সময় ছিল না। আমার মাথায় কেবল এটাই ঘুরছিল যে আমার ছেলেকে সাহায্য করতে হবে, সে বিপদে পড়েছে।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিছু ক্ষেত্রে এটি কেবল একটি রেকর্ড করা বার্তা নয়, বরং আরও জটিল হতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতারকরা 'টেক্সট-টু-স্পিচ' টুল বা 'ভয়েস স্কিনিং' ব্যবহার করে রিয়েল-টাইমে জালিয়াতের কণ্ঠকে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কণ্ঠে রূপান্তর করে ফেলে। এর ফলে হ্যাকাররা সরাসরি ভুক্তভোগীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের মতো কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে, যা প্রতারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এ ছাড়া 'কলার আইডি স্পুফিং' কৌশলের মাধ্যমে তারা পরিচিত কোনো নম্বর থেকেও কল করতে পারে। ফলে আপনার ফোনে মায়ের নম্বর ভেসে উঠলেই যে ওপাশে আপনার মা আছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভয়েস ক্লোনিং প্রতারণার পরিমাণ

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ভয়েস ক্লোনিং, এআই-জেনারেটেড ফিশিং ইমেইল এবং রোমান্স স্ক্যামসহ এআই-সম্পর্কিত জালিয়াতির কারণে আমেরিকানরা ৮৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ হারিয়েছেন। জালিয়াতি চক্র পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব থেকে শুরু করে সহকর্মী বা পেশাদার সেবা প্রদানকারীদের কণ্ঠও নকল করছে।

যুক্তরাজ্যের স্টার্লিং ব্যাংক এবং কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে তাদের গ্রাহকদের এই ভয়েস ক্লোনিং জালিয়াতি নিয়ে সতর্ক করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই-এর তৈরি কণ্ঠস্বর এখন এতটাই বাস্তবসম্মত যে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল মানুষের কণ্ঠ থেকে তা আলাদা করা প্রায় অসম্ভব।

কীভাবে বাঁচবেন এই প্রতারণা থেকে?

আগে মনে করা হতো, ফোনে অদ্ভুত কোনো বিরতি বা কণ্ঠের ওঠানামা থাকলে তা এআই-এর তৈরি কণ্ঠ হতে পারে। কিন্তু এআই-এর আধুনিক অগ্রগতির ফলে এই লক্ষণগুলো এখন আর নাও থাকতে পারে। ইউসি বার্কলের অধ্যাপক এবং গেটরিয়েল সিকিউরিটির প্রধান বিজ্ঞানী হ্যানি ফরিদ বলেন, 'ওপাশের কণ্ঠটি আসল কি না তা নিশ্চিত করার চেষ্টা না করে বরং জালিয়াতির সাধারণ লক্ষণগুলোর দিকে খেয়াল রাখা উচিত। যেমন, ওপাশের ব্যক্তিটি কি কোনো নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে তাড়াহুড়ো করছে? সে কি এই ঘটনাটি অন্য কাউকে জানাতে নিষেধ করছে? সে কি অস্বাভাবিক উপায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠাতে বলছে?' বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের প্রশ্নগুলো মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

এই ধরনের ফোন কল পেলে তৎক্ষণাৎ অন্য কোনো উপায়ে, যেমন অন্য কোনো ফোনে ক্ষুদ্রে বার্তা বা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে বা সেই প্রিয়জন যেখানে থাকতে পারে এমন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করা উচিত। ক্যালিফোর্নিয়ার ভুক্তভোগী মা ডেবোরা ডেল মাস্ত্রো জানান, প্রতারকদের টাকা পাঠানোর পরই কেবল তিনি তার মেয়েকে ফোন করেছিলেন। ফোন করতেই মেয়ে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে এবং জানায় যে সে শান্তিতে অফিসেই কাজ করছে!

এ ছাড়া পরিবার বা সহকর্মীদের মধ্যে একটি সুরক্ষামূলক 'কোড ওয়ার্ড' বা গোপন শব্দ ঠিক করে রাখা যেতে পারে, যা কেবল সেই পরিবারের মানুষেরাই জানবে এবং যা ইন্টারনেটে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কোনো বিপদের সময় জরুরি ফোন কলে পরিচয় নিশ্চিত করতে এই কোড জানতে চাওয়া যেতে পারে।

এআই-জেনারেটেড মিডিয়া বিশেষজ্ঞ হেনরি আজডার বলেন, 'সাধারণ মানুষের কাছে এটা ধরা পড়ার আশা করা মোটেও ঠিক নয়। আমি নিজেই এটা আলাদা করতে হিমশিম খাই, আর বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই তা-ই হয়।'