কে-পপের পথেই এগোচ্ছে কে-বিউটি, বদলে যাচ্ছে সৌন্দর্যের ধারণা
কে-পপের পথেই এগোচ্ছে কে-বিউটি, বদলে যাচ্ছে সৌন্দর্য

দক্ষিণ কোরিয়ার পপ সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়। ব্ল্যাকপিঙ্ক হোক বা বিটিএস—প্রতিটি কনসার্টে ভাষার বাধা পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তের ভক্তরা কোরিয়ান গানের তালে মাতেন। তবে কোরিয়ান সৌন্দর্য পণ্য বা ‘কে-বিউটি’ এতদিন একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফর্সা ত্বকের জন্যই মূলত তৈরি হতো ফাউন্ডেশন ও কনসিলার। বিজ্ঞাপনেও দেখা যেত শুধু তরুণ, ছিপছিপে ও অতি ফর্সা মডেলদের। বিশ্বজুড়ে যেখানে প্রসাধনী ব্র্যান্ডগুলো সব বর্ণের মানুষের জন্য পণ্য তৈরিতে জোর দিচ্ছে, সেখানে কোরিয়ার এই রক্ষণশীল অবস্থানকে অনেকেই সেকেলে বলে মনে করছিলেন।

কে-পপ তারকাদের ভূমিকা

মজার বিষয় হলো, কোরিয়ার পপ তারকারা অনেক আগেই এই গতানুগতিক ধ্যানধারণা ভেঙে দিয়েছেন। বিগ ব্যাং ব্যান্ডের জি-ড্রাগন নারী পোশাক ও অনুষঙ্গ নিজের ফ্যাশনে অন্তর্ভুক্ত করে লিঙ্গবৈষম্যের প্রথা ভাঙার জন্য পরিচিত। গত জানুয়ারিতে প্যারিসে শ্যানেলের ‘স্প্রিং-সামার ২০২৫’ কুচুর শো-তে তাঁকে দেখা যায়। স্ট্রে কিডস ব্যান্ডের ফেলিক্সের স্টাইল প্রায়ই তার ‘বহুরূপী’ ক্ষমতার জন্য আলোচিত, যেখানে তিনি সহজেই কোমল ও পরীর মতো সাজ থেকে সাহসী গথিক সাজে নিজেকে বদলে নিতে পারেন। গত ২২ আগস্ট ২০২৫-এ দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে লুই ভিতোঁর একটি আঞ্চলিক হাই জুয়েলারি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া গত বছর বিটিএস সদস্য ভি এবং জাংকুক যথাক্রমে টিরটির ও চ্যানেল বিউটির শুভেচ্ছাদূত নিযুক্ত হয়েছেন। তারা বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে রূপচর্চা কেবল নারীদের একচেটিয়া অধিকার নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৈচিত্র্যের পথে কে-বিউটি

তবে সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ কোরিয়ায় বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এখনো কিছুটা পিছিয়ে। দেশটিতে ঐতিহাসিকভাবেই কঠোর অভিবাসন নীতি ও জাতিগত সমরূপতার কারণে সৌন্দর্যের মানদণ্ড এখনো নির্দিষ্ট একটি ছকে বাঁধা। কোরিয়ানরা কি কেবল নিজেদের বাজারের জন্যই পণ্য বানাবে নাকি বৈশ্বিক দর্শকদের কথা ভাববে—তা নিয়ে বিতর্ক চলছে অনেকদিন ধরে। লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউএসসি অ্যানেনবার্গ স্কুলের অধ্যাপক হাই জিন লি সিএনএনকে বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে কোরিয়ান রূপচর্চাপণ্যগুলো মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছিল। কে-বিউটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়েছে খুব সাম্প্রতিক সময়ে। ফলে পণ্যগুলো যখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সব বর্ণের মানুষের উপযুক্ত শেড তৈরির প্রশ্নটি সামনে আসছে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী কোরিয়ায় বিদেশি জনসংখ্যা ৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা দেশটিকে একটি বহুজাতিক সমাজ হওয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, মিন্টেলের তথ্য অনুযায়ী ৯ হাজার কোটি ডলারের এই কে-বিউটি বাজার এখন ফ্রান্সকে টপকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রসাধনী রপ্তানিতে শীর্ষে উঠে এসেছে। কস্টকো, টার্গেট বা সেফোরার মতো আন্তর্জাতিক চেইন শপগুলোতে এখন কোরিয়ান ব্র্যান্ডগুলোর জয়জয়কার।

নতুন উদ্যোগ ও ব্র্যান্ডের পরিবর্তন

এই পরিবর্তনের পালে হাওয়া দিতে মেহজাবিন আলফারের মতো উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন। নিজের সন্তানদের কে-পপ প্রীতি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ‘কে প্লাস ব্রাউন’ (K+Brown) নামে একটি ব্র্যান্ড চালু করেছেন, যা মূলত শ্যামলা বা গাঢ় বর্ণের ত্বকের (মেলানিন-রিচ স্কিন) কথা মাথায় রেখে কাজ করবে। আলফার বলেন, ‘প্রতিটি কনসার্টে আমি হিজাব পরা মেয়ে, লাতিনা বা আফ্রো-আমেরিকানদের দেখি। কে-পপ নিয়ে তাদের প্রবল উৎসাহ থাকলেও কে-বিউটি তাদের কথা বলছিল না।’ তাঁর এই উদ্যোগ দক্ষিণ কোরিয়া সরকারেরও সমর্থন পেয়েছে।

দেশি কোরিয়ান ব্র্যান্ডগুলোও এখন খোলস ছেড়ে বের হচ্ছে। ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা ‘টিরটির’ (Tirtir) ব্র্যান্ডটি আগে মাত্র তিনটি শেডের ফাউন্ডেশন বিক্রি করত। কিন্তু বিশ্ববাজারের চাহিদাপত্রে সাড়া দিয়ে তারা এখন ৪০টি শেড বাজারজাত করছে। এমনকি গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তারা ১৫০টি ভিন্ন শেড তৈরির সক্ষমতাও অর্জন করেছে। টিরটির-এর গ্লোবাল বিজনেস ডিভিশনের প্রধান মনিকা পার্ক সিএনএনকে বলেন, ‘টিরটির এখন কেবল বিশ্বজুড়ে সমাদৃত একটি কোরিয়ান ব্র্যান্ডই নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক বিউটি ব্র্যান্ড যা প্রকৃত অর্থেই মানুষের বিচিত্র চাহিদাকে বোঝে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে। আমাদের কাছে অন্তর্ভুক্তি কেবল একবারের কোনো অর্জন নয়; এটি একটি চলমান দায়িত্ব।’

এ ছাড়া ‘অ্যামোর প্যাসিফিক’ বা ‘জুং সেম মুল বিউটি’র মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন গাঢ় ত্বকের জন্য কুশন ফাউন্ডেশন ও কাস্টমাইজড লিপস্টিক তৈরি করছে। অধ্যাপক লি মনে করেন, কে-বিউটি যদি নিজেকে বিশ্ব দরবারে টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে তাদের আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সংগীতের পর এবার রূপচর্চার জগতেও দক্ষিণ কোরিয়া বর্ণ ও বর্ণের সীমানা মুছে দেওয়ার পথে হাঁটছে। কে-পপ ব্যান্ড ‘ক্যাটসাই’ (Katseye) যেমন বিভিন্ন দেশের সদস্যদের নিয়ে গঠিত, কে-বিউটিও এখন সেই বৈচিত্র্যময় কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে চাইছে।