মা দিবসে মায়েদের সংগ্রাম ও স্বপ্নের গল্প শোনালেন নারীরা
মা দিবসে মায়েদের সংগ্রাম ও স্বপ্নের গল্প শোনালেন নারীরা

‘মা দিবস’ সামনে রেখে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বিশেষ উদ্‌যাপনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘মন জানালা’। এটি চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের জন্য কাজ করা একটি সামাজিক প্ল্যাটফর্ম। এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হসপিটাল।

মায়েদের গল্পে আবেগের স্পর্শ

অনুষ্ঠানে নিজেদের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের গল্প শোনালেন মায়েরা। কেউ শোনালেন সন্তানদের বিদেশে রেখে একাকী অপেক্ষার কথা, কেউ আবার অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার গর্বের কথা। কারও জীবনে এসেছে স্বামী হারানোর বেদনা, আবার কেউ খুঁজে পেয়েছেন মা ও মেয়ের বন্ধনে নতুন শক্তি। পাশাপাশি উঠে এসেছে নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও পরবর্তী প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান। ভালোবাসা, কষ্ট, দায়িত্ব আর স্বপ্নে বোনা এসব গল্পে এক ভিন্ন আবেগে ধরা দিলেন মায়েরা।

স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা

অনুষ্ঠানে মায়েদের জন্য দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা করেন ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেহানা আরজুমান হাই। তিনি বলেন, মাকে ঘিরেই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ও প্রেরণা তৈরি হয় এবং প্রত্যেক সন্তানের বেড়ে ওঠা থেকে জীবনের প্রতিটি ধাপে একজন মা নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রেহানা আরজুমান আরও বলেন, সংসার, চাকরি ও সন্তান লালন-পালনের ব্যস্ততায় অনেক নারী নিজের যত্ন নেওয়ার সুযোগ পান না। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এ সময় সুস্থ থাকতে পুষ্টিকর খাবার, মৌসুমি ফল ও সবজি খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই চিকিৎসক আরও বলেন, স্বাস্থ্যসচেতনতার অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম ও যোগব্যায়াম করতে হবে। প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো এবং এমনভাবে হাঁটা উচিত যাতে শরীরে ঘাম ঝরে। পাশাপাশি গান শোনা, বই পড়া বা বাগান করার মতো ব্যক্তিগত শখের চর্চাও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অনুপ্রেরণার গল্প

মা দিবসে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এক মা—সাঈদা বিলকিস। তিনি বলেন, একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে পারলে জীবনের ‘৮০ শতাংশ সমস্যা’ সমাধান করা সম্ভব। তাঁর মতে, যে যেটিতে দক্ষ— রান্না, সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন বা অন্য কোনো কাজে, সেটিকেই কাজে লাগিয়ে নিজের আয় নিশ্চিত করা উচিত।

অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে আরেক মা কামরুন্নাহার মিলি বলেন, তাঁর এ অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে তাঁর মা ও নানির স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণাই সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। বিশেষ করে চিকিৎসকদের নিয়ে নানির অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মধ্যে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন জন্ম নেয়। নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া একজন নারী আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগোতে পারেন না।

সুমি রহমান নামের আরেকজন বলেন, বয়সের কারণে তাঁর মা ঢাকায় আসতে না চাইলেও মন খারাপ হলেই তিনি মাকে এনে কিছুদিন নিজের কাছে রাখেন। স্বামীর মৃত্যু তাঁর জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি ভেঙে পড়েছিলেন এবং গভীর হতাশায় ডুবে যান। তাঁর মা এ সময় তাঁকে সাহস দিয়েছেন। এখন তাঁর মেয়ের সহযোগিতা ও ভালোবাসায় তিনি ভালো আছেন।

সন্তানদের বিদেশে রেখে একাকী জীবনের অনুভূতির কথা তুলে ধরেন ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, সন্তানদের ফোন বা বার্তার অপেক্ষাতেই তাঁর প্রতিদিনের সময় পার হয়। ঘুম থেকে উঠে ছেলের পাঠানো ছোট্ট একটি বার্তাও তাঁকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। তিনি বলেন, ২০২১ সালে নিজের মাকে হারানোর স্মৃতিও তাঁকে নাড়া দেয়। তাঁর আক্ষেপ, জীবিত থাকতে মাকে কখনো বলা হয়নি, মা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

জুলিয়েট সরকার একা মা হিসেবে নিজের সন্তানকে লালন-পালন করা, শিক্ষিত করার অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের গল্প তুলে ধরেন। নারীদের আত্মনির্ভর হওয়ার পাশাপাশি নিজেকে ভালোবাসার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আয়োজকের বক্তব্য

অনুষ্ঠানে ‘মন জানালা’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মৌসুমী মৌ নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক নারীর এমন সক্ষমতা থাকা উচিত, যাতে তাঁকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়। প্রয়োজনে ঘর ও বাইরে, দুই জায়গাতেই একসঙ্গে নারীরা কাজ করতে পারেন। নিজের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মৌসুমী মৌ বলেন, নারীর জীবন মানেই একসঙ্গে বহু দায়িত্ব সামলানো। মায়েদের নিজের শক্তি ও সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানের অন্যান্য দিক

অর্চি রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ‘মন জানালা’র চেয়ারম্যান হাসিবুল করিম উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অর্ধশতাধিক মা অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারী নারীদের মেডিক্যাল চেকআপ করা হয়। উল্লেখ্য, ‘মন জানালা’ মূলত ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের মানসিক সুস্থতা, শারীরিক সচেতনতা, আত্মোন্নয়ন ও আর্থিক স্বনির্ভরতা নিয়ে কাজ করে। এই প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১৭ হাজার নারী যুক্ত আছেন।