ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে একমাত্র কন্যাসন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তর
বাংলাদেশসহ মুসলিম সমাজে পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল বিষয়। প্রায়শই দেখা যায়, বয়স্ক পিতা-মাতা তাদের জীবদ্দশায় কোনো একটি সন্তানকে, বিশেষ করে একমাত্র কন্যাসন্তানকে, সমস্ত সম্পত্তি লিখে দিতে চান। ইসলামিক শরিয়তের আলোকে এই প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে উলামায়ে কিরামের মধ্যে নানাবিধ মতামত ও ব্যাখ্যা বিদ্যমান।
ওসিয়তের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের শর্তাবলি
যদি কোনো বাবা-মা ওসিয়ত (উইল) এর মাধ্যমে নির্দেশ দেন যে, তাদের মৃত্যুর পর সমস্ত সম্পদ কন্যাসন্তান পাবে, তবে এই ওসিয়তের বৈধতা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে অন্যান্য ওয়ারিশদের সম্মতির উপর। ইসলামিক উত্তরাধিকার আইনে স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং অন্যান্য সন্তানরা ওয়ারিশ হিসেবে স্বীকৃত।
উদাহরণস্বরূপ, একজন বাবা যদি তার কন্যাকে সব সম্পত্তি দেওয়ার ওসিয়ত করেন, কিন্তু তার স্ত্রী বা নিজের পিতা-মাতা জীবিত থাকেন, তাহলে এই ওয়ারিশরা যদি ঐ ওসিয়ত অনুমোদন করেন, কেবল তখনই তা বাস্তবায়নযোগ্য হবে। অন্যথায়, এই ধরনের ওসিয়ত বাস্তবায়নে শরিয়তগত বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
উলামায়ে কিরামের মতভেদ ও হাদিসের ব্যাখ্যা
এ বিষয়ে ইসলামিক পণ্ডিতদের মধ্যে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। একদল উলামা হাদিসের একটি বর্ণনার উপর ভিত্তি করে দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেন যে, কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত করা জায়েজ নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক হকদারের অংশ নির্দিষ্ট করেছেন। সুতরাং কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত করা যাবে না।" (সুনান আবু দাঊদ: হাদিস-২৮৭০, সুনান ইবনে মাজাহ: হাদিস-২৭১৩)
এই হাদিসের আলোকে অনেক ইসলামিক স্কলার যুক্তি দেখান যে, ওয়ারিশদের জন্য ওসিয়ত করা শরিয়তসম্মত নয়, কারণ আল্লাহতায়ালা ইতিমধ্যেই প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
অপরদিকে, অন্য একদল আলেম মত প্রকাশ করেন যে, যদি অন্যান্য সমস্ত ওয়ারিশ স্বেচ্ছায় ও পূর্ণ সম্মতিতে এই ওসিয়ত মেনে নেন, তাহলে বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি জায়েজ হতে পারে। তাদের মতে, পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্মতির ভিত্তিতে পরিবারিক সম্পদ বণ্টনের এই পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য।
জীবদ্দশায় দান বা হিবা করার বিধান
ওসিয়তের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জীবদ্দশায় সরাসরি দান বা হিবা করার মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর। যদি বাবা-মা তাদের একমাত্র কন্যাসন্তানকে জীবিত অবস্থায়ই সব সম্পদ দান করে দেন বা তার নামে লিখে দেন, তবে এই ক্ষেত্রে অধিকাংশ আলেমের মত হলো যে, এটি জায়েজ।
কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে, যখন অন্য কোনো সন্তান না থাকে, তখন একমাত্র কন্যাসন্তানকে সব সম্পদ দেওয়ায় অন্য কারো অধিকার লঙ্ঘিত হয় না। তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো যে, এই দানের পিছনে যদি অন্য কোনো ওয়ারিশকে ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য কাজ করে, তাহলে এটি ইসলামিক নীতির পরিপন্থী বলে বিবেচিত হবে।
কুরআনের সূরা নিসার ১১ নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন: "তোমাদের মাতা-পিতা ও তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্য থেকে তোমাদের উপকারে কে অধিক নিকটবর্তী, তা তোমরা জানো না।" এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আলেমগণ নির্দেশ দেন যে, আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক হকদারকে তার নির্ধারিত অংশ প্রদান করা আবশ্যক।
সামগ্রিক উপসংহার ও ব্যবহারিক নির্দেশনা
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামিক শরিয়তের দৃষ্টিতে:
- একমাত্র কন্যাসন্তানকে জীবদ্দশায় সব সম্পদ দান করা জায়েজ, যদি অন্য কোনো সন্তান না থাকে এবং অন্য ওয়ারিশদের অধিকার লঙ্ঘিত না হয়।
- ওসিয়তের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে চাইলে অবশ্যই অন্যান্য সকল ওয়ারিশের সম্মতি অপরিহার্য।
- কোনো অবস্থাতেই অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি বণ্টন করা উচিত নয়, কারণ এটি ইসলামিক ন্যায়বিচার ও সাম্যের নীতির পরিপন্থী।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এড়াতে ইসলামিক বিধানগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনে квалифициিত ইসলামিক স্কলার বা আইনবিদের পরামর্শ গ্রহণ করা সমীচীন। সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমঝোতা, ন্যায়নীতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হওয়া উচিত মুখ্য উদ্দেশ্য।



