ট্রাম্পের এআই-তৈরি যিশুরূপী ছবি নিয়ে বিতর্ক, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ছবি পোস্ট করা হয়েছিল, যেখানে তাঁকে যিশুখ্রিষ্টের রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১২ এপ্রিল পোস্ট করা এই ছবিটি পরদিন ১৩ এপ্রিল মুছে ফেলা হয়, তবে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ছবিতে ট্রাম্পকে একজন আরোগ্যদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি লাল ও সাদা রংয়ের বাইবেল-অনুপ্রাণিত পোশাক পরিহিত অবস্থায় একজন অসুস্থ ব্যক্তির কপালে হাত রেখে ঐশী আলো বিচ্ছুরণ করছেন। পটভূমিতে মার্কিন পতাকা, শিকারি ঈগল ও যুদ্ধবিমানের চিত্র দেখা গেছে।
খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের তীব্র নিন্দা
খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অনুসারীরা এই ছবিটিকে ধর্ম অবমাননা বলে অভিহিত করে ব্যাপক নিন্দা জানিয়েছেন। সমালোচকদের মধ্যে ট্রাম্পের নিজস্ব মাগা সমর্থকরাও রয়েছেন, যারা এই পদক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন। ডানপন্থী নেতা মার্জোরি টেইলর গ্রিন এক্স প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে বলেন, ‘এটা শুধু ধর্ম অবমাননা নয়, এটা অ্যান্টিক্রাইস্ট বা যিশুবিরোধী মনোভাব।’ ছবিটি পোস্ট করার পর এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ট্রাম্প প্রশাসন তা মুছে ফেলে এবং প্রেসিডেন্ট নিজে বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ছবিতে তাঁকে একজন চিকিৎসক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি মানুষকে সুস্থ করে তুলছেন।
ধর্ম অবমাননার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননা শব্দটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ ব্লাসফেমিয়া থেকে উদ্ভূত, যা প্রাথমিকভাবে অপবাদ বা কুৎসা রটানোর কাজ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম হেইন্স-আইটজেনের মতে, খ্রিষ্টধর্মে যিশুকে ঈশ্বরের সমতুল্য বিবেচনা করা শুরু হলে এই ধারণার পরিসর বিস্তৃত হয় এবং যিশুকে অবমাননা করাও ধর্ম অবমাননার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গির্জা, সন্ত ও পোপকেও এই ধারণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, এমনকি অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ হতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮৯ সালে সালমান রুশদির দ্য স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসকে ইসলাম ধর্মের অবমাননা বলে ঘোষণা করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন।
ট্রাম্পের পূর্ববর্তী বিতর্কিত পদক্ষেপ
এটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথমবার নয় যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠেছে। গত বছরও তিনি একটি এআই-তৈরি ছবি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তাঁকে পোপ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, যা ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া, রোববারের এই পোস্টের এক সপ্তাহ আগে হোয়াইট হাউসের ইস্টার অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা পলা হোয়াইট-কেইন প্রেসিডেন্টকে খ্রিষ্টের সঙ্গে তুলনা করেন, যা কিছু খ্রিষ্টানের কাছে অস্বস্তিকর বলে মনে হয়েছে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির জিম ওয়ালিসের মতো বিশেষজ্ঞরা ছবিতে যুদ্ধবিমানের উপস্থিতিকে যিশুর শান্তির শিক্ষার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
কিছু বিশেষজ্ঞ, যেমন ডেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেনিস ডয়েল, ধর্ম অবমাননা হয়েছে কি না তা নির্ধারণে অভিপ্রায় জানাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তিনি বলেন, ‘কার্যত তিনি যা করেছেন, তা ধর্ম অবমাননা। তবে নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি কি সত্যিই একজন ধর্ম অবমাননাকারী? আমার মনে হয়, এর চূড়ান্ত বিচার কেবল ঈশ্বরই করতে পারেন।’ এই ঘটনাটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ধর্মীয় আবেগ ও আত্মপ্রচারণাকে একত্র করার একটি উদাহরণ, যা তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় অভূতপূর্ব বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, এই এআই-তৈরি ছবি পোস্ট করে ট্রাম্প একটি জটিল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন, যা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এবং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ এই বিষয়টির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে প্রভাবিত করছে।



