মানিকগঞ্জে বালুমহাল ইজারা: রাজস্ব নয়, সমঝোতার খেলা চলছে
মানিকগঞ্জে বালুমহাল ইজারায় সমঝোতার অভিযোগ

মানিকগঞ্জে বালুমহাল ইজারা প্রক্রিয়ায় সমঝোতার অভিযোগ

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের ইজারা প্রক্রিয়া আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির বদলে সমঝোতার অভিযোগে ভর করছে বাংলা ১৪৩৩ সনের দরপত্র। কম দর দেখিয়ে কোটি টাকার রাজস্ব বিঘ্নিত করার একটি সুপরিকল্পিত নীলনকশার আভাস মিলেছে পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে, যা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

সরকারি মূল্যের চেয়ে ৭০% কম দর

লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের সরকারি ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল সাত কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা। অথচ দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা খান এন্টারপ্রাইজ মাত্র দুই কোটি ২০ লাখ টাকা প্রস্তাব দেয়, যা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৭০.৩৩ শতাংশ কম। এই বিশাল ব্যবধান পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি করেছে।

গত ২৯ মার্চ দরপত্র উন্মুক্তের দিন জেলা প্রশাসক ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানা স্পষ্ট ভাষায় জানান, সরকারি মূল্যের তুলনায় এত কম দর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার অসন্তোষ প্রকাশ্য ছিল, যা প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দরপত্র স্থগিত করেন এবং পুনরায় আহ্বানের ঘোষণা দেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সিডিউল বিক্রি ও অংশগ্রহণের রহস্য

তথ্য অনুযায়ী, এই বালুমহালের জন্য ১৪টি সিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র ৩টি। অংশ নেয় খান এন্টারপ্রাইজ, সজিব করপোরেশন ও জমিদার এন্টারপ্রাইজ। বাকি ১১টি সিডিউল রহস্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, যা প্রতিযোগিতা সীমিত করার ইঙ্গিত বহন করে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র সম্ভাব্য দরদাতাদের মাঠের বাইরে রেখে প্রতিযোগিতা কমিয়ে এনেছে। ফলে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দর নামিয়ে আনার পথ তৈরি হয়েছে, যা সরকারের রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বালুমহালের নাটকীয় ইতিহাস

লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের দরপত্র ইতিহাস কম নাটকীয় নয়। ১৪৩০ বাংলা সনে মূল্য ছিল চার কোটি ৩ লাখ টাকা, পরের বছরই তা লাফিয়ে ওঠে ১১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ১১১ টাকায়। সে সময় ইজারা পায় আওয়ামী লীগ নেতা আবিদ হাসান বিপ্লবের প্রতিষ্ঠান এশিয়ান বিল্ডার্স।

কিন্তু ১৪৩২ বাংলা সনে হঠাৎ রাজস্ব নেমে আসে পাঁচ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৯ টাকায়, অর্থাৎ প্রায় ৫২.০৯ শতাংশ কমে। ইজারা পায় মিথিলা এন্টারপ্রাইজ, তাদের প্রস্তাব ছিল ৫ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৩২ টাকা। এবার ১৪৩৩ বাংলা সন দর নেমে আসে ২ কোটির ঘরে, যা সংশ্লিষ্টদের মতে একই মহালের বাজারমূল্যের দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মদদের অভিযোগ

অভিযোগের তীর এবার প্রশাসনের ভেতরেও। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বালুমহালের নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার বাইরে বালু উত্তোলনের লিখিত অভিযোগ থাকলেও তা রহস্যজনকভাবে থেমে যায়।

কার্যত কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ইজারাদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চৌহদ্দি উপেক্ষা করে পছন্দের স্থানে বালু উত্তোলন চলে প্রকাশ্যেই, যা স্থানীয় পরিবেশ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগে, সরকারের রাজস্ব হ্রাস প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে প্রশাসনিক ছায়া ও রাজনৈতিক মদদ। ফলে রাজস্ব আদায়ের বদলে একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই যেন হয়ে উঠেছে মূল লক্ষ্য, যা জনগণের আস্থা হ্রাস করছে।

সমঝোতার চক্র ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দরপত্রকে কেন্দ্র করে সমঝোতার একটি চক্র সক্রিয়, যারা পরিকল্পিতভাবে দর কমিয়ে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পথ তৈরি করছে। প্রথম দফার দরপত্র বাতিল হলেও একই কৌশল পুনরায় প্রয়োগের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, "লেছড়াগঞ্জ বালুমহালে সরকারি মূল্য ছিল সাত কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা। তিনটি সিডিউল জমা পড়েছে, কিন্তু দরগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমরা সেকেন্ড দরপত্রে যাচ্ছি।" তিনি আরও যোগ করেন, "বিধি অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে। কোনো ঠিকাদার সীমারেখার বাইরে গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

এই ঘটনা মানিকগঞ্জের স্থানীয় অর্থনীতি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ প্রক্রিয়ায় সংস্কারের দাবি জোরালো করছে।