ব্রি ধান-৮৮ বীজে মিশ্রণে কিশোরগঞ্জের হাওরে কৃষকদের বিপাকে
কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় বিএডিসির ব্রি ধান-৮৮ বীজে মিশ্রণের কারণে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান নিয়ে গভীর শঙ্কায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। গত শুক্রবার করিমগঞ্জের বড় হাওরের খয়রত এলাকায় দেখা গেছে, সপ্তাহখানেক পরেই পুরোদমে শুরু হওয়ার কথা থাকা বোরো ধান কাটা নিয়ে এখন উদ্বেগ ছড়িয়েছে। হাওরজুড়ে প্রস্তুতি চললেও, যেসব কৃষক বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) থেকে ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজ এনে চাষ করেছিলেন, তাঁরা এখন দুশ্চিন্তায় আছেন।
বিভিন্ন জাতের ধানে জমিতে অরাজকতা
এই জাতের ধান চাষ করা কৃষকদের খেতে এক জাতের ধান না হয়ে, নানা জাতের ধান দেখা যাচ্ছে। একই গুচ্ছে কয়েক জাতের ধানের মধ্যে কোনোটা পেকে গেছে, কোনোটা আধা পাকা, আবার কোনোটার শিষই বের হয়নি। এসব ধান কীভাবে কাটবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না কৃষকেরা। পাকা ধান কাটার চেষ্টা করলে নষ্ট হবে আধা পাকা ধান। আবার আধা পাকার জন্য অপেক্ষা করলে ঝরে যাবে পাকাগুলো। জেলার করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও বাজিতপুরের হাওরে ব্রি-ধান ৮৮ চাষে দেখা দিয়েছে এমন অস্বাভাবিকতা, যা বেশি মাত্রায় করিমগঞ্জ ও ইটনা উপজেলার হাওরে লক্ষ্য করা গেছে।
কৃষক হাবিবুর রহমান (৫০) বলেন, “১৩ কানি জমিতে বিএডিসির ৮৮ ধান করছিলাম। ধানতো শুরুতে চিনন যায় না। অহন আমার খেতো অর্ধেকেও ৮৮ ধান নাই। বাকি ধানগুলো চার-পাঁচ জাতের হইছে। কুনুডা পাইক্যা গেছে, কুনুডার হগলে দুধ আইছে। কুনুডার শিষ অহনও কাঁচা। অহন আমি ধান ক্যামনে কাটবাম।” তিনি আরও যোগ করেন, ধারকর্জ করে চাষ করায় কমপক্ষে ৪০০ মণ ধান আশা করলেও এখন ১০০ মণ পাওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী খেতেও একই অবস্থা
খয়রত গ্রামের কৃষক ওমর সিদ্দিক (৪০) ১৫ বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, যা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘ফ্লাড রিকন্সট্রাকশন ইমারজেন্সি অ্যাসিস্টেন্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)’-এর আওতায় প্রদর্শনী খেত হিসেবে নির্ধারিত ছিল। বীজধান সরবরাহ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কিন্তু এখানেও একই অবস্থা দেখা গেছে। খেতে শুধু ব্রি-ধান ৮৮–এর জায়গায় বিভিন্ন জাতের ধান হয়েছে, যা ফলনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
একই অভিযোগ বড়হাওরে বোরো আবাদ করা কৃষক মদন গ্রামের আক্তার মিয়া (৬৫) ও জমির উদ্দিনের (৫৫)। তাঁরা জানান, যাঁরা ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, সবার খেতেই মিশ্রণ ঢুকে গেছে, ফলে প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যাঁরা ঋণ করে চাষাবাদ করেছেন, তাঁদের পথে বসতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
কৃষি কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবার পুরো জেলায় বোরো ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে, যার মধ্যে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে। করিমগঞ্জ, ইটনাসহ বেশ কিছু হাওরে এ জাতের অস্বাভাবিক ফলন দেখা গেছে। কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেছেন, মাঠপর্যায় থেকে সমস্যাটি শুনে কৃষি কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে এবং তাঁরা ব্রি-ধান ৮৮–এর বীজে মিশ্রণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।
বিএডিসির উপপরিচালক (বীজ বিপণন) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমরাও মাঠপর্যায়ে গিয়ে এমন কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি, কোথা থেকে এমন বীজ কৃষকদের হাতে গেল। কোনো ডিলার যদি কৃষকদের বিএডিসির প্যাকেটে নকল বীজ দিয়ে থাকে, আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।”
বিএডিসি (বীজ বিপণন) সূত্রে জানা যায়, বোরো চাষের জন্য মৌসুমের শুরুতে এবার প্রায় ৩৭০ টন ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে, পরে আরও ৩১৮ টন বীজ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন উৎস থেকে বীজ আসায় অভিযোগ পাওয়ার পর ঠিক কোথায় সমস্যাটি হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে বিএডিসি উপপরিচালক (বীজ উৎপাদন) হারুনুর রশীদ দাবি করেন, ন্যাচারাল মিউটেশন, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, বা বীজের উৎসে ত্রুটির কারণেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
মোটকথা, এবার যাঁরাই বিএডিসির ব্রি-ধান ৮৮–এর বীজের চারা রোপণ করেছেন, তাঁদের সবার খেতের অবস্থা কমবেশি একই রকম। কৃষকদের ভাষ্য, তাঁরা ধানের বীজ কিনেছিলেন বিএডিসির অনুমোদিত স্থানীয় ডিলার ও সাবডিলারদের কাছ থেকে, কিন্তু বীজে মিশ্রণ থাকায় ভিন্ন ভিন্ন জাতের ধান হয়েছে জমিতে। এই অস্বাভাবিক চিত্র দেখে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা, যারা কৃষি ও বীজ অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না।



