পহেলা বৈশাখের ইতিহাস ও সংস্কৃতি: গবেষক মোস্তফা তারিকুল আহসানের বিশ্লেষণ
পহেলা বৈশাখের ইতিহাস ও সংস্কৃতি: গবেষকের বিশ্লেষণ

পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পর্যালোচনা

ফোকলোর গবেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তফা তারিকুল আহসান দুই দশকের অধিক সময় ধরে ফোকলোর বিষয়ে গবেষণা ও অধ্যাপনা করছেন। তার অসংখ্য গবেষণা-পুস্তক ও নিবন্ধ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আমেরিকান ফোকলোর সোসাইটির সদস্য এবং ফোকলোর গবেষণা পত্রিকা ‘ব্রাত্য’-র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পহেলা বৈশাখের উৎপত্তি ও প্রাচীনত্ব

মোস্তফা তারিকুল আহসান উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের ব্যাপক উদযাপনের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। আশির দশকের শেষের দিকে বড় আকারে উদযাপন শুরু হওয়ার পর থেকেই সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, “বেশিরভাগ গবেষক মনে করেন, সম্রাট আকবর ষোড়শ শতকে খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে হিজরি সনের পরিবর্তে বাংলা সন চালু করেন। তবে পহেলা বৈশাখ সে সময় এভাবে পালিত হত না।” খাজনা আদায় ফসল তোলার সঙ্গে যুক্ত ছিল, এবং বছরের প্রথম দিনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল বাংলা অঞ্চলের ফসল তোলার সময়ের সাথে মিল রেখে। আকবরের দরবারের পণ্ডিতেরা এই ব্যবস্থা ঠিক করেছিলেন। যদিও কেউ কেউ রাজা শশাঙ্ককে এর প্রবর্তক মনে করেন, তবে তা সমর্থনযোগ্য নয়। ফলে, পহেলা বৈশাখের প্রাচীনত্ব বেশি দাবি করা হলেও তা প্রামাণিক নয় বলে তিনি মত দেন।

রাজনৈতিকীকরণ ও অর্থনৈতিক প্রভাব

প্রশ্ন উঠেছে, চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদযাপনের কারণে এই উৎসবের রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে কিনা। আহসান জবাব দেন, “কোনো উৎসবই তার প্রাথমিক অবস্থায় থাকে না, এবং এর নেতৃত্বও সময়ের সাথে পাল্টে যায়।” তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, নববর্ষে শোভাযাত্রা ছাড়াও ছায়ানট, রমনার বটমূলে সমবেত গান, বাংলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমির লোকজ উৎসবের আয়োজন এর অংশ। চারুকলার ছাত্ররা ফোক আর্টের মাধ্যমে নানা থিম নিয়ে প্রতিকৃতি তৈরি করে, যা মূল আর্ট থেকে আলাদা। তিনি বলেন, “এতে নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যোগ দেয়, তাই কোনো রাজনৈতিক দল একে ব্যবহার করতে পারে, তবে আমাদের কাছে এরকম কোনো তথ্য নেই।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পহেলা বৈশাখের বাণিজ্যিকীকরণ ও রাজনৈতিক দিক নিয়েও তিনি আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “এটি আমাদের প্রধান লোকজ ও জাতীয় উৎসব, এবং বিপুল মানুষের অংশগ্রহণের ফলে এর একটি বড় অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।” সরকার ভাতা দেয়, বিশেষ খাবারের চাহিদা বাড়ে, মেলা বসে, এবং পোশাক বিক্রি বৃদ্ধি পায়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “এটা সার্বজনীন উৎসব এবং রাজনৈতিক উৎসব নয়। বর্তমান সরকার সবার অংশগ্রহণে এটা পালনের উদ্যোগ নিয়েছে।”

ধর্মীয় প্রসঙ্গ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়

পহেলা বৈশাখকে সনাতনী বা হিন্দু ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখা হয় কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে আহসান বলেন, “ধর্ম হলো সংস্কৃতির অংশ, এবং প্রতিটি ধর্মের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, বাঙালি সংস্কৃতি মানে হিন্দু সংস্কৃতি নয়; দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষ পাশাপাশি বাস করে বাঙালি সংস্কৃতি তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “মুসলিমরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই নববর্ষের উৎসবে যোগ দেয়, কারণ এটা কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক উৎসব।” ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি যোগ করেন, “আমরা মুসলিম সেটা যেমন সত্য, তেমনি আমরা বাঙালি সেটাও সত্য।”

গ্রামীণ ও শহুরে রূপান্তর

বাংলা নববর্ষের উদযাপনে গ্রামীণ ও শহুরে সমাজের রূপান্তর নিয়ে আহসান বলেন, “এটা আশির দশকে ঢাকা থেকে শুরু হয়ে অন্য নগর ও গ্রামের দিকে ছড়িয়েছে।” মিডিয়ার প্রভাবে গ্রামের মানুষও এখন সংশ্লিষ্ট হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, “গ্রামে ‘হালখাতা’ নববর্ষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে, এবং চৈত্রসংক্রান্তির কথাও মনে রাখতে হবে।” সংস্কৃতির শক্তির কারণে শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে, এবং বৈশাখ এখন সার্বজনীন উৎসব হিসেবে নতুন পোশাক, খাওয়া-দাওয়া, মেলা, ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নতুন সাংস্কৃতিক চেতনার জন্ম দিয়েছে।

লোকঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

গ্রাম বাংলায় গাজনের মেলা, বাউল গান ইত্যাদি আয়োজন সংকুচিত হচ্ছে কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে আহসান বলেন, “সংস্কৃতির রূপান্তর ও পরিবর্তন খুব স্বাভাবিক।” ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের প্রভাবে লোকসংস্কৃতির কিছু উপাদান হারিয়ে যাচ্ছে, তবে তিনি মনে করেন, “যেখানে পরিবেশ ও দর্শক আছে, সেখানে বাউল গান, মেলা, নৌকাবাইচ চলতে থাকবে, তবে সময়ের সাথে কিছু পরিবর্তন হবে।” তিনি যোগ করেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রার পেছনে লোকঐতিহ্য রয়েছে, যা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও লোকসৃষ্টির সংযোগকে প্রতিফলিত করে।”

সর্বোপরি, মোস্তফা তারিকুল আহসান পহেলা বৈশাখকে একটি গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসব হিসেবে দেখেন, যা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করছে।