বান্দরবানে বিষু উৎসবে ঘিলাইখেলা: তঞ্চঙ্গ্যা ঐতিহ্যের প্রেমের বন্ধনের খেলা
বিষু উৎসবে ঘিলাইখেলা: তঞ্চঙ্গ্যা ঐতিহ্যের প্রেমের খেলা

বান্দরবানে বিষু উৎসবে ঘিলাইখেলা: তঞ্চঙ্গ্যা ঐতিহ্যের প্রেমের বন্ধনের খেলা

পাহাড়ি অঞ্চলের তরুণীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা হলো ঘিলাইখেলা। সম্প্রতি বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় এই খেলায় মেতে উঠেছেন স্থানীয় তরুণীরা। গতকাল বিকেলে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, একজন তরুণী ‘ঘিলা’ ছুড়ছেন, যা তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়ের উৎসব বিষুর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঐতিহ্য ও কিংবদন্তির মেলবন্ধন

তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিষু উৎসবে ঘিলাইখেলায় অংশ নেন ত্রিপুরা তরুণ–তরুণী ও শিশু-কিশোরেরা। এই খেলা সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার একটি অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। চাকমা প্রেমগাথা রাধামন-ধনপুদী (তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ধুনপুরী) পালায় এই খেলার বিবরণ পাওয়া যায়। কিংবদন্তি অনুসারে, দিগ্বিজয়ী রাজপুত্র রাধামন ও তাঁর প্রেমিকা ধনপুদী ঘিলাইখেলা খেলে অমর প্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। রাধামনের ‘ঘিলাই’ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ধনপুদীর শরীর বিদ্ধ করেছিল, কিন্তু এই আঘাত তাদের ভালোবাসার বন্ধনকে আরও প্রগাঢ় করে তুলেছিল।

উৎসবের প্রথম দিনে রাতজুড়ে খেলা

বিষু উৎসবের প্রথম দিন, যা ফুল বিষু নামে পরিচিত, সেখানে রাতজুড়ে ঘিলাইখেলা অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা সবাই যেন কিংবদন্তির রাধামন-ধনপুদীর মতো ভালোবাসার পরীক্ষায় মেতে ওঠেন। প্রতিবছর বিষু উৎসবে মহাধুমধামের সঙ্গে এই খেলার আয়োজন করা হয়। আজ সোমবার রোয়াংছড়ি উপজেলায় এই খেলার আয়োজন রয়েছে বলে জানা গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খেলার উপকরণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ঘিলাইখেলা বুনো এক লতার বীজ দিয়ে খেলা হয়, যেটি পাহাড়ের মানুষের কাছে ‘ঘিলাই’ নামে পরিচিত। রাঙামাটি শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা তাঁর ‘তঞ্চঙ্গ্যা জাতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, রাধামন-ধনপুদীর ঘিলাইখেলার প্রভাবে তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমা সমাজে প্রাচীনকাল থেকে এটি জনপ্রিয় ঐতিহ্যের খেলা হয়ে উঠেছে। যদিও চাকমা সমাজ থেকে এখন অনেকটাই এই খেলা হারিয়ে গেছে, তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের উৎসব-পার্বণে এটি টিকে আছে।

সামাজিক বন্ধন ও বিনোদনের মাধ্যম

ঘিলাইখেলা একসময়ের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সমাজে সামাজিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদে বিনোদন দিয়েছে। এখন উৎসবের খেলা হলেও সেকালে অবসরে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের নিত্যদিনের বিনোদনের মাধ্যম ছিল এটি। এ জন্য ঘিলাইখেলা ভালোবাসার বন্ধনের খেলা হিসেবে বিবেচিত হয়।

টুর্নামেন্টের বিস্তারিত তথ্য

বান্দরবানে বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা (বাতকস) আয়োজিত বিষু মেলায় ঘিলাইখেলা টুর্নামেন্ট উপকমিটির আহ্বায়ক ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা প্রথম আলোকে বলেন, ‘গিলালতার পরিপক্ব ফলের বীজকে তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমারা “ঘিলাই” বলেন। এটি দিয়ে খেলা হয় বলে খেলাটির নাম “ঘিলাইখেলা”। উৎসবে ঘিলাইখেলা বিরামহীনভাবে সারা রাত খেলা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীপূর্ণ এই খেলায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে অত্যন্ত ধৈর্য, সহনশীলতার পরিচয় দিতে হয়। সেখানেই পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার বন্ধন প্রগাঢ় হয়ে উঠে।’

তিনি আরও বলেন, ‘খেলোয়াড়রা কয়েক প্রকারের ঘিলাইখেলা খেলেন, যেমন মকখেলা, কুইচুক খেলা, গামাইত খেলা, ব্যাঙখেলা, পাইচে খেলা। প্রতিটি খেলায় ৩ থেকে ১১ জন করে দুই দলে খেলে থাকেন। শুধু মেয়েদের, শুধু পুরুষদের কিংবা নারী-পুরুষ একসঙ্গে নানা ক্যাটাগরিতে এই খেলা হয়। মাঠে একদল ঘিলাই পেতে রাখেন, বিপক্ষ দল পেতে রাখা ঘিলাই লক্ষ্য করে তাদের ঘিলাই ছুড়ে মারেন। বিপক্ষ দলের পাতানো সব কটি ঘিলাই কুপোকাত করতে পারলে খেলার একটি ধাপ শেষ হয়ে যায়। এভাবে প্রতিটি খেলায় পাঁচ থেকে ১৩টি লক্ষ্যভেদী ধাপে প্রতিপক্ষ দলকে হারিয়ে অন্য দলটি জয়লাভ করে।’

এবারের আয়োজনের বিশদ বিবরণ

এবারে বিষু উৎসবে রোয়াংছড়ি উপজেলা সদরে তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে ঘিলাইখেলার আয়োজন করা হয়েছে। বান্দরবান ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী-পুরুষের ৪৭টি দল এতে অংশগ্রহণ করেছে বলে সংস্থার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় ঘিলাইখেলার উদ্বোধন করেন বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরী, যা এই ঐতিহ্যবাহী খেলার গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।