রাজশাহীতে বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি: বৈশ্বিক বাস্তবতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন
বাংলা নববর্ষ বরণের প্রস্তুতিতে মাতোয়ারা রাজশাহী। পুরনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে স্বাগত জানাতে বৈশাখী শোভাযাত্রার আয়োজন চলছে পুরোদমে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তৈরি করছেন বর্ণিল মোটিফ, যেখানে বাঙালির ঐতিহ্যের পাশাপাশি উঠে আসছে সমসাময়িক বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এবারের শোভাযাত্রায় বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে মোটিফ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক এ কে এম আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিতে এমন মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে মানুষ আবার পুরনো বাহনের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হতে পারে, এমন বার্তা রয়েছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি শক্তি, গতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। শোভাযাত্রার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকবে এই মোটিফ।
পাশাপাশি জাতীয় মাছ ইলিশ, শৈশবের স্মৃতিবাহী টমটম গাড়ি এবং প্রাচীন রাজা-বাদশা ও ঐতিহাসিক চরিত্রের মুখোশ স্থান পাচ্ছে আয়োজনে। বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরতে একটি বিশেষ ইনস্টলেশন আর্ট প্রদর্শনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একাডেমিক ভবনে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা বাঁশ, লোহা ও কাগজ দিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করে বিভিন্ন মোটিফ তৈরি করছেন। রঙতুলির ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে সেগুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে।
শিক্ষার্থীদের উদ্যম ও অর্থায়নের চিত্র
মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী নাসির বলেন, ‘গত বছর রমজানের কারণে বড় পরিসরে আয়োজন সম্ভব হয়নি। তবে এবার নতুন উদ্যমে কাজ করছি। শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নতুন অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছি।’ অর্থায়ন প্রসঙ্গে চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শ্রম ও অর্থায়নেই প্রস্তুতি চলছে। সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখতে কোনও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর নেওয়া হয়নি।
এদিকে, কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত প্রতিপাদ্য না থাকায় এবং বিতর্ক এড়াতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বৈশাখী শোভাযাত্রা নামেই আয়োজন করা হচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সময় ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম আনা হয়েছে এবং সন্ধ্যার মধ্যেই কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নববর্ষের বিস্তৃত আয়োজন
পহেলা বৈশাখ সকাল ৭টায় রাজশাহী বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা থেকে শিশু একাডেমি পর্যন্ত বৈশাখী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল সাড়ে ৭টায় শিশু একাডেমিতে জাতীয় সংগীত ও ‘এসো হে বৈশাখ’ গান পরিবেশন করা হবে। সকাল পৌনে ৮টায় একই স্থানে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানমালা অনুষ্ঠিত হবে। ১ ও ২ বৈশাখ দুই দিনব্যাপী শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে নববর্ষের মেলা।
- মেলার প্রথম দিন গম্ভীরা, আলকাপ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নৃত্য ও পুতুল নাট্য আয়োজন করা হবে।
- মেলার দ্বিতীয় দিন বাউল ও লোক গান এবং যাত্রাপালার আয়োজন করা হবে।
পহেলা বৈশাখ সুবিধাজনক সময়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার, সব হাসপাতাল, শিশু পরিবার ও শিশু সদনে খৈ, মুড়ি, মুড়কি ও বাতাসার মতো ঐতিহ্যবাহী খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে দিনব্যাপী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর এবং রাজশাহী বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রবেশমূল্য ছাড়া দর্শনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
শখের হাঁড়ির কারুশিল্পে ব্যস্ততা
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মৃৎশিল্পীরা তৈরি করছেন নানা সামগ্রী। বৈশাখ বরণে মাটির তৈরি হাঁড়িসহ ছোট বাচ্চাদের মাটির খেলনা তৈরির অন্যতম কারিগর হলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার বসন্তপুরের মৃৎশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল। তিনি তৈরি করেন ঐতিহ্যবাহী ‘শখের হাঁড়ি’। পহেলা বৈশাখের মুখে পালের বাড়ি এখন মাটির তৈরি হাঁড়ি, হাতি, ঘোড়া, হরিণ, পুতুলসহ নানা পণ্যে ঠাসা।
মাটির তৈরি বিভিন্ন আকারের হাঁড়িতে শৈল্পিক কারুকার্য দেখে মন ছুঁয়ে যাবে যে কারও। প্রতিবছর বৈশাখে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিপুল চাহিদা থাকে এই শখের হাঁড়ির। আসন্ন বৈশাখী মেলাকে ঘিরে বসন্তপুর গ্রামে শখের হাঁড়িসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কারুশিল্পীদের ব্যস্ততা বেড়েছে। দিনরাত সমানতালে কাজ করছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পালপাড়ায় ৭০ বছর বয়সী সুশান্ত কুমার এবং তার দুই ছেলে মাটির তৈরি নানান জিনিসপত্র তৈরি করছেন। এসব জিনিসপত্র বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের তৈরি পণ্যের বেশির ভাগই গৃহস্থালি ও সাংসারিক সাজসজ্জার উপকরণ। কারিগররা জানান, বৈশাখ এলেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গার মানুষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এতে কাজের চাপ বেড়ে যায়। তবে বৈশাখ শেষ হলে আর কোনও বিশেষ চাহিদা থাকে না।
শখের হাঁড়ির কারিগর মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল জানান, বৈশাখী মেলার আয়োজনে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। সারা দেশ থেকে ক্রেতারা আসেন শখের হাঁড়ি কিনতে। চার পিসের শখের হাঁড়ি, ছোট পাতিল, সাজি, পঞ্চ সাজি, মাটির পুতুল ও খেলনা ক্রেতারা নিয়ে যান। কারিগর আনন্দ কুমার পাল বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই শখের হাঁড়ি দেখছি। আগে অনেক পরিবারই এই কাজ করতো। এখন কারিগরের সংখ্যা কমছে। শৌখিন মানুষের কাছে শখের হাঁড়ির চাহিদা আছে, তবে আগের মতো নেই।’
দেশের স্বনামধন্য কারিগর সুশান্ত কুমার পাল জায়গা করে নিয়েছেন চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে। সেখানে তার ছবিসহ গল্প রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পদক ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন পুরস্কার। তিনি ঘুরে বেড়েছেন জাপান, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল। আয়োজকদের আশা, রাজশাহীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শোভাযাত্রা উপভোগ করতে আসবেন। এ ধরনের সর্বজনীন উৎসব গ্রামাঞ্চলে আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে, যা মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



