মা দিবসের বাণিজ্যিকীকরণ ও মায়ের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার গুরুত্ব
মা দিবসের বাণিজ্যিকীকরণ ও মায়ের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা

যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবসকে একটি স্বীকৃত ছুটির দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আনা জার্ভিসের প্রচারাভিযান শুরু হয় ১৯০৫ সালে, যে বছর তাঁর মা অ্যান রিভস জার্ভিস মারা যান। অ্যান জার্ভিস ছিলেন একজন শান্তিকর্মী, যিনি মার্কিন গৃহযুদ্ধে উভয় পক্ষের আহত সৈন্যদের সেবা করতেন এবং জনস্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানের জন্য মা দিবস ওয়ার্ক ক্লাব তৈরি করেন। তিনি এবং আরেক শান্তিকর্মী ও নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের কর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড হোয়ি ‘শান্তির জন্য মা দিবস’ পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেখানে মায়েরা প্রার্থনা করবেন যেন তাঁদের স্বামী ও সন্তানেরা আর যুদ্ধে প্রাণ না হারান।

মা দিবসের উৎপত্তি ও আনা জার্ভিসের ভূমিকা

১৮৭০ সালে জুলিয়া ওয়ার্ড হোয়ি তাঁর ‘মা দিবস’ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি বিশ্বের সব দেশের মায়েদের একত্র হওয়ার আহ্বান জানান, যাতে তারা আন্তর্জাতিক বিরোধের সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান এবং বৃহত্তর মানবিক শান্তির স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে পারেন। আনা জার্ভিস এটাকে সম্মান জানাতে এবং সব মায়ের সম্মান জানানোর জন্য একটি দিন নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মা হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি পৃথিবীতে অন্য যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে আপনার জন্য বেশি কিছু করেছেন।

বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই

জার্ভিস মা দিবসকে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে শুরু করেছিলেন এবং এই দিবস প্রতিষ্ঠায় তিনি সফল হন। তবে ১৯২০-এর দশকের শুরুতে হলমার্ক কার্ডসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মা দিবসের কার্ড বিক্রি শুরু করলে তিনি এর বাণিজ্যিকীকরণে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হন। লেখক বলেন, দামি উপহারের চেয়ে মায়ের সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প শোনা ও তাঁর অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করাই প্রকৃত কৃতজ্ঞতা। জার্ভিস বিশ্বাস করতেন, এসব প্রতিষ্ঠান মা দিবসের মূল ভাবনাকে বিকৃত করছে এবং এর অপব্যবহার করছে। তাঁর মতে, এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তরিক আবেগ ও ভালোবাসা প্রকাশ করা, কোনোভাবেই বাণিজ্যিক লাভ অর্জন নয়। একপর্যায়ে তিনি এই দিবসটি বর্জনের উদ্যোগ নেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মায়ের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার গুরুত্ব

আমরা অনেকেই হয়তো জানি না মা দিবসের নেপথ্যের গল্প। মাকে উইশ করছি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দিচ্ছি, মাকে নিয়ে ভালো ভালো কথা লিখছি আর দিন শেষে দেখছি কটা লাইক এবং শেয়ার পড়ল। আসলে যুগটাই এখন দেখানোর। আমরা যা করছি, তাই দেখাচ্ছি। একবার ভেবে দেখুন, প্রকৃতির খুব কাছে গিয়ে তার সান্নিধ্য পাওয়ার যে আনন্দ, সেই আনন্দ কি প্রকৃতির ছবি তুলে লোকেদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ায় পাওয়া যায়? নদীর বুকে শান্ত নিরবধি শীতল বাতাসের মগ্ধতা অনুভবে যে প্রশান্তি, তা কি নদীর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলাতে আছে? তেমনি মাকে বছরে একদিন গিফট দিয়ে তা ফলাও করে জানানোর চেয়ে মায়ের একলা শূন্য ঘরে প্রতিদিন কিছুটা সময় দিন, সেই কাটানো সময়ের এবং গল্পের যে দাম, তার মূল্য বাজারের কোনো পণ্যের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।

বাজারের পণ্য বনাম প্রকৃত ভালোবাসা

বাজারে গিয়ে দেখুন ছোট্ট একটা কেক এক হাজার টাকায় পাওয়া যাবে কি না, সন্দেহ। কিন্তু এক হাজার টাকা দিয়ে কেক বা ৫০০ টাকা দিয়ে ফুলের তোড়া কেনার সামর্থ্য কজন সাধারণ মানুষের আছে? যেখানে ঝিঙা–পটোলের কেজি শতকের ঘরে। তার চেয়ে ভালো মায়ের জন্য কিছু পান–সুপারি আর এক মাসের ডায়াবেটিস ও ব্লাড সুগারের ওষুধ কেনা। অনেকেরই এতে আপত্তি থাকতে পারে, কারণ এই সমাজে টাকাওয়ালা মানুষ নিতান্ত কম নয়। মায়ের সঙ্গে চলুন গল্প করি, মাকে জানি। বুঝতে চেষ্টা করি, মা তাঁর ফেলে আসা জীবনে সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে কী কী শখ মেটাতে পারেননি। চেষ্টা করি মায়ের সেই চাওয়া পূরণ করতে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী।

সন্তানের দায়িত্ব ও মা-বাবার প্রতি সম্মান

আমরা সাধারণত মনে করি, গ্রামের নিরক্ষর বা কম শিক্ষিত ছেলেমেয়েরাই মা–বাবার সঙ্গে অশোভন আচরণ করে বা তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে চায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা যারা উচ্চশিক্ষিত তারাও মা–বাবাকে অবহেলা ও অসম্মান করে থাকি। আবার এমন অনেক মা–বাবাও আছেন, যারা সন্তানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো আচরণ প্রকাশ করতে চান না। এই শহরে অনেক মা আছেন যারা ছেলে এবং ছেলের বউয়ের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে পারেননি বলে মেয়ের বাড়ি এসে থাকেন। অথচ একদিন এই মা কিন্তু তাঁর সব ভালো লাগা, শ্রম–ভালোবাসা দিয়ে বাড়িটা সাজিয়েছিলেন। শেষ বয়সটা কাটছে নিজের প্রিয় আঙিনা ছেড়ে শহরের চারদেয়ালে বন্দী হয়ে।

বাবা-মায়ের ভুল ও দায়িত্বহীনতা

এটাও সত্যি, বাবা–মা মানেই যে তাদের কোনো ভুল নেই, তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো মা–বাবারাও ভুল করেন। অনেক সময় তাঁরা অবুঝের মতো সন্তানদের ওপর নিজেদের মতামত চাপিয়ে দেন, যা সব সময় সঠিক নয়। আমি একবার আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হিতৈষী সংঘে গিয়েছিলাম তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে। সেখানে অনেকেই কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন, কারণ তাঁদের ভেতরে জমে ছিল এক ধরনের নীরব অভিমান। নিজেদের জীবন বা কষ্টের কথা বাইরের মানুষের কাছে বলতে চাইতেন না। এমনকি অনেকেই তাঁদের ছেলেমেয়ের নামও বলতে চাইতেন না—শুধু এই ভেবে, যেন সমাজের চোখে সন্তানেরা ছোট হয়ে না যায়।

খারাপ মা-বাবার উদাহরণ ও সমাজের বাস্তবতা

হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ থাকলেও একজনও খারাপ বাবা নেই। আমি তাঁর কথার সঙ্গে একমত নই। অসংখ্য খারাপ বাবা আমাদের চারপাশে আছে। কেউ নিজের সন্তানকে শারীরিক মানসিকভাবে নির্যাতন করছেন, কেউ সন্তানকে ফেলে আরেকটা বিয়ে করে দেশান্তরি হচ্ছেন। তাহলে তারা কী করে ভালো বাবা হন! এই সমাজে যেমন খারাপ বাবা আছেন, তেমনি খারাপ মা–ও আছেন—যাঁদের গল্প আমরা অনেক সময় জানি না, কিংবা জানলেও বলতে চাই না। আমার এক বন্ধুর মা, তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে রেখে অন্য একজনকে বিয়ে করেছিলেন। মেয়েদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তারা কোথায় থাকবে—সেসব নিয়ে তিনি একবারও ভাবেননি। অবশ্যই একজন শিক্ষিত নারীর নিজের জীবন কীভাবে চালাবেন, কাকে বিয়ে করবেন বা কার সঙ্গে থাকবেন—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত যদি সন্তানদের সঙ্গে বোঝাপড়া ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে নেওয়া হয়, তাহলে তা সবার জন্যই স্বস্তিকর ও মঙ্গলজনক হয়।

মায়ের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা

পৃথিবীতে ভালো মায়ের সংখ্যাই বেশি, খারাপ মায়ের সংখ্যা খুবই কম। অভাব–অনটনের কারণে কোনো মা সন্তানকে ফেলে চলে গেছেন—এমন ঘটনা শুনেছেন? স্বামী বেকার, মাতাল বা দায়িত্বহীন হলে অনেক স্ত্রী সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসেন—এমন উদাহরণ সমাজে অসংখ্য আছে। কিন্তু নিজের সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারে ফেলে দিয়ে শুধু ব্যক্তিগত স্বস্তির জন্য চলে যাওয়া—এমন ঘটনা মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কারণ, সাধারণভাবে একজন মা সন্তানের জন্য নিজের কষ্ট, অভাব, অপমান—সবকিছু সহ্য করেও পাশে থাকেন। তাই যখন কোনো মা নিজের দায়িত্ব ভুলে সন্তানকে অসহায় অবস্থায় ফেলে অন্য জীবনে চলে যান, তখন তা শুধু পারিবারিক ভাঙন নয়, এক ধরনের মানবিক ব্যর্থতাও হয়ে ওঠে।

উপসংহার: আনা জার্ভিসের বিশ্বাসের প্রাসঙ্গিকতা

তাহলে কি আনা জার্ভিসের সেই বিশ্বাস ভুল ছিল? তিনি বলেছিলেন, ‘মা হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি পৃথিবীতে অন্য যে কারও চেয়ে আপনার জন্য বেশি কিছু করেছেন।’ হয়তো কিছু ব্যতিক্রম আছে, কিছু বেদনাদায়ক গল্পও আছে। তবু পৃথিবীর অসংখ্য মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই আমাদের এই বিশ্বাসকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে। এই বিশ্বাস চির–অম্লান থাক আমাদের হৃদয়ে।