মেট্রোরেলের কারণে ঢাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি: গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ
ঢাকার যানজটে নাকাল নাগরিকদের জন্য মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল সুবিধা স্বস্তি ও আধুনিকতা এনেছে, যাতায়াতের সময় বাঁচিয়েছে। তবে এই দ্রুতগামী গণপরিবহন বিপুল ব্যয়ে নির্মিত হলেও এর রুট ধরে একটি নতুন দুর্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মেট্রোরেলের কারণে আশপাশের এলাকায় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছে, যা নগর-পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত দিচ্ছে।
গবেষণায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র
এনভায়রনমেন্টাল চ্যালেঞ্জেস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি যৌথ গবেষণা অনুসারে, মেট্রোরেলের ২০ কিলোমিটার পথ এবং এর আশপাশের ৫০০ মিটার এলাকায় তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষণাটি স্পষ্ট করে যে, দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এলাকাটি এখন একটি ‘তাপ করিডরে’ পরিণত হয়েছে। উন্নয়নের এই ‘তাপীয় মূল্য’ ভবিষ্যৎ নগর-পরিকল্পনার জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালে এই এলাকার গড় তাপমাত্রা ছিল ২৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে। গবেষকরা এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:
- বৃক্ষনিধনের ফলে সূর্যের আলো সরাসরি পিচঢালা পথে পড়া
- কংক্রিটের অত্যধিক তাপ শোষণক্ষমতা, যা দিনের তাপ ধরে রেখে রাতে বিকিরণ করে
- উঁচু অবকাঠামোর কারণে বায়ুপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি
পরিবেশগত প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশ ও প্রতিবেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কতগুলো গাছ কাটা পড়েছে, তার সঠিক হিসাব খোদ মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বা বন বিভাগের কাছেও নেই—এটি প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতারই বহিঃপ্রকাশ। ঢাকার মতো একটি শহরে যেখানে ২৫ শতাংশ সবুজ থাকা প্রয়োজন, সেখানে বর্তমান হার ১০ শতাংশের নিচে। এমতাবস্থায়, মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামো যদি ‘হিট আইল্যান্ড’ বা তাপীয় দ্বীপ হিসেবে কাজ করে, তবে সাধারণ মানুষের স্বস্তি শেষ পর্যন্ত অস্বস্তিতেই পর্যবসিত হবে।
সমাধানের পথ ও সুপারিশ
গবেষকরা এই সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু কার্যকরী পথ বাতলে দিয়েছেন। তাদের সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- মেট্রোরেলের পিলারগুলোর গা ঘেঁষে লতাজাতীয় গাছ লাগানো
- স্টেশনের ছাদ এবং লাইনের দুই পাশের ভবনগুলোতে ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করা
- মেট্রোরেলের নিচের সড়ক বিভাজকগুলোকে প্রকৃত সবুজ আচ্ছাদনের আওতায় আনা
নগরায়ণের জন্য মেট্রোরেলের বিকল্প নেই সত্যি, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি জনপদকে উত্তপ্ত চুল্লিতে পরিণত করে, তবে তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই গবেষণার ফলাফল গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, প্রতিটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব প্রশমনের দিকে নজর দিতে হবে।



