সেন্ট মার্টিনে কাছিমের ডিম পাড়ার সংখ্যা তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে
বঙ্গোপসাগরের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পর্যটক সীমিতকরণ এবং সরকারি নির্দেশনার কঠোর বাস্তবায়নের ফলে অলিভ রিডলে প্রজাতির কাছিমের ডিম পাড়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার ডিম পাড়া কাছিমের সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে, যা দ্বীপের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের একটি ইতিবাচক সংকেত।
হ্যাচারিতে কাছিম ছানার জন্ম ও সাগরে অবমুক্তকরণ
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মীরা সেন্ট মার্টিন দ্বীপের গলাচিপা এলাকায় স্থাপিত হ্যাচারিতে কাছিমের ডিম সংগ্রহ করে সেগুলো থেকে বাচ্চা ফোটানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। সম্প্রতি, একটি হ্যাচারিতে ডিম থেকে ১২২টি কাছিম ছানার জন্ম হয়েছে এবং পরে সেগুলো সাগরে অবমুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মী আবদুল আজিজের নেতৃত্বে ১১ জন স্বেচ্ছাসেবী হ্যাচারি দুটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন।
আবদুল আজিজের মতে, হ্যাচারি দুটিতে বর্তমানে ৪৫টি কাছিমের পাড়া ৫ হাজার ২২টি ডিম সংরক্ষণ করা আছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে সৈকতে ডিম পাড়তে আসা ৬১টি কাছিমের মধ্যে থেকে এই ডিমগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। গত বছর মাত্র ২০টি কাছিম ডিম পাড়তে এসেছিল, যার ফলে এবারের সংখ্যা বৃদ্ধি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
পর্যটক সীমিতকরণের ইতিবাচক প্রভাব
সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার গত দুই বছর ধরে পর্যটক সীমিতকরণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ১২টি নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ফলে দ্বীপের সৈকতে শামুক-ঝিনুক, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর বিস্তার ঘটছে এবং দক্ষিণে সবুজ প্যারাবন পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। এই উদ্যোগের ফলে কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশও ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা উল্লেখ করেন যে, সরকারি পদক্ষেপের কারণে সেন্ট মার্টিনে মৃত কাছিম ভেসে আসার পরিমাণ অনেক কমেছে, যদিও কক্সবাজার সৈকতে গত তিন মাসে ২২০টি মরা মা কাছিম ভেসে এসেছে। এগুলোর ৯০ শতাংশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও পেটে ডিম ছিল, যা মাছ ধরার নিষিদ্ধ জালে আটকা পড়ার ফল বলে মনে করা হয়।
কাছিম রক্ষায় চলমান সরকারি উদ্যোগ
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিচালক মো. জমির উদ্দিন জানান, সেন্ট মার্টিনের পাশাপাশি কক্সবাজার এবং মহেশখালীর সোনাদিয়া সৈকতেও কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করা হচ্ছে। কাছিমের পাড়া ডিম যেন শিয়াল, কুকুর, গুইসাপ বা বেজি খেয়ে ফেলতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সামুদ্রিক কাছিম, যাদের 'বঙ্গোপসাগরের ঝাড়ুদার' হিসেবে অভিহিত করা হয়, তারা আগাছা, ক্ষতিকর জেলিফিশ এবং ময়লা আবর্জনা খেয়ে সমুদ্রকে দূষণমুক্ত রাখে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। তাই তাদের সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ
সেন্ট মার্টিনের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমদ খান ও নুর আহমদ উল্লেখ করেন যে, ১০-১৫ বছর আগে এই দ্বীপের সৈকতে তিন প্রজাতির কাছিম ডিম পাড়তে আসত, কিন্তু নানা কারণে গত কয়েক বছর তাদের উপস্থিতি কমে গিয়েছিল। এখন অলিভ রিডলে প্রজাতির কাছিম ফিরে আসছে, এবং গত বছর ২ হাজার ১৬৫টি বাচ্চা সাগরে অবমুক্ত করা হয়েছিল, যা এবার ছয় হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকার ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি সেন্ট মার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা কাছিমসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য একটি সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করবে। তবে মাছ ধরার নিষিদ্ধ জালে আটকা পড়ে কাছিমের মৃত্যু রোধ করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।



