মনু নদের পাড়ে অশোকমঞ্জরির রঙিন উৎসব
পাতার ফাঁকে ফুটে আছে অশোকমঞ্জরি, যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা এক জীবন্ত ছবি। শনিবার সকালে মৌলভীবাজারের মনু নদের পাড়ে শান্তিবাগ ওয়াকওয়েতে দূর থেকেই চোখে পড়ে কমলা রঙের মায়াবী দৃশ্য। গাছের ডালে ডালে ছড়িয়ে আছে উজ্জ্বল মাধুরী, মনে করিয়ে দেয় কবিতার সেই লাইন—‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে’। একটি নয়, একাধিক অশোকগাছে এখন সবুজ পাতার ছাউনিতে চলছে রঙের দোলা, ফুলের মেলা।
ফুলের মেলা ও প্রকৃতির সজীবতা
গাছগুলো যেন হৃদয় উজাড় করে ফুল ফুটিয়েছে। ডালে ডালে, পাতার আড়ালে খোঁপার মতো ফুটে আছে কমলা রঙের থোকা থোকা ফুল। বাসি হয়ে যাওয়া ফুলে লাল রং ধরেছে, তৈরি করেছে এক রঙিন বৈচিত্র্য। পিঁপড়ার দল ও কালো ভ্রমর কিছু ফুলে ঘুরছে, যেন প্রকৃতির জীবন্ত অর্কেস্ট্রা। কোনো গাছে ঝুলন্ত তামাটে কচি পাতারা দুলছে, যা দর্শকদের মুগ্ধ করছে। গাছের নিচে, ঘাসের জমিনে ঝরে পড়েছে অশোকমঞ্জরি, তৈরি হয়েছে কমলা রঙের সুই-সুতার কাজ। সবুজের বুকে ফুলগুলো কাঁথা সেলাইয়ের মতো গেঁথে দেওয়া হয়েছে, যা প্রকৃতির শিল্পকর্মের নিদর্শন।
বৃষ্টির পর প্রকৃতির ঝকঝকে রূপ
মৌলভীবাজার শহরসহ বিভিন্ন স্থানে শুক্রবার ভোররাত থেকেই বৃষ্টি ঝরেছে। কখনো বাজপড়া মেঘের চমকে দেওয়া ডাক, কখনো ঝোড়ো হাওয়া—এভাবেই সারা দিন কেটেছে। এটা ছিল ফাল্গুনের প্রথম বৃষ্টি, শীত শেষে প্রকৃতিতে নেমেছে সজীবতার বার্তা। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ ছড়িয়েছে হাওয়ায়, গাছের পাতা থেকে ধুলাবালু ধুয়েমুছে গেছে, সবকিছু ঝকঝকে হয়ে উঠেছে। শনিবার সকালেও থেমে থেমে কয়েক দফা বৃষ্টি ঝরেছে, যা বসন্তকালের এই অশোক ফুলের মেলা আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
অশোকের ঐতিহ্য ও তাৎপর্য
অশোক অর্থ দুঃখহারী—এ কথা নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মার। তিনি তাঁর ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে অশোকের বর্ণনা শুরু করেছেন, যেখানে উল্লেখ করেছেন এর বিশেষ তাৎপর্য। অশোকের ভেষজ গুণ আছে, আছে শীতল ছায়া, মধুগন্ধ ও প্রস্ফুটনের ঐশ্বর্য। এটি দেশি বৃক্ষ, খ্যাতিও সুপ্রাচীন, এবং এর ফুল প্রেমের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশ ও মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় এই বৃক্ষ মাঝারি আকারের, কাণ্ড মসৃণ, ধূসর ও শাখায়িত। পাতাগুলো দীর্ঘ, চওড়া ও বর্শাফলাকৃতির, কচি পাতা নিচের দিকে ঝুলন্ত ও তামাটে রঙের। নতুন ফুল ফুটলে কমলা রঙের হয়ে থাকে, কিন্তু বাসি ফুলের রং লাল। পুষ্পমঞ্জরি পিঁপড়ার প্রিয় আবাসস্থল, এবং প্রায় সারা বছর অশোক ফুল ফুটলেও বসন্ত-হেমন্তেই ফোটে বেশি। ফলের আকৃতি শিমের মতো, চ্যাপ্টা ও হালকা বেগুনি রঙের, এবং বীজ থেকে সহজেই চারা জন্মে।



