গাজীপুরের শ্রীপুরে বনে লাগলো দাবানল, প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন হুমকির মুখে
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বিন্দুবাড়ি এলাকায় ভাওয়াল বনাঞ্চলে বুধবার দুপুরে দাবানলের মতো আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথসংলগ্ন এই বনাঞ্চলে আগুন এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, একক চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। জ্বলন্ত আগুন বাতাসের তোড়ে দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে বিভিন্ন ছোট-বড় প্রাণী ও পাখপাখালি জীবন বাঁচাতে প্রাণপণে ছুটতে বাধ্য হয়।
বনাঞ্চলে আগুনের বিস্তৃতি ও প্রভাব
গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বিন্দুবাড়ি এলাকার বনে এই আগুন লাগে। শুধু বিন্দুবাড়ি নয়, গাজীপুরের বিভিন্ন বনাঞ্চলেও একই দিনে কর্ণপুর, গোসিংগা, বরমী, খোঁজেখানিসহ মোট সাত থেকে দশটি স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। চলতি সপ্তাহে শ্রীপুরের সিমলাপাড়া, মাওনা, বারতোপা, শিরীষগুড়িসহ বিভিন্ন এলাকায়ও বনে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে।
আগুনে শাল-গজারিগাছের নিচে জন্ম নেওয়া ছোট চারা, স্থানীয় ভাষায় ‘কফিজ’, পুড়ে যায়। পাশাপাশি ছোট ছোট লতাগুল্ম ও অন্যান্য উদ্ভিদও ধ্বংস হয়। শুকনো পাতার কারণে আগুন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে।
প্রাণীদের উপর মারাত্মক প্রভাব
আগুন লাগার সময় গুইসাপ, ইঁদুর, বেজি, শিয়ালসহ নানা প্রাণীকে দৌড়ে অন্যত্র চলে যেতে দেখা গেছে। অনেক প্রাণী আগুনে পুড়ে মারা যায়, আর পুড়ে যায় বিভিন্ন বন্য পোকামাকড়। ধোঁয়ার মধ্যে দল বেঁধে পাখিরা উড়ে যেতে বাধ্য হয়, যা তাদের বাসস্থান ও খাদ্য শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটায়।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীপুর রেঞ্জের অধীনে মোট বনভূমির পরিমাণ ২৪ হাজার ২৭১ একর। এ অঞ্চলে একসময় ১০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৬ প্রজাতির উভচর, ৯ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৩৯ প্রজাতির পাখির অস্তিত্ব ছিল। গত দুই দশকে এসব প্রাণীর বেশির ভাগই বিলুপ্তির পথে, এবং বনাঞ্চলে আগুন লাগা এ সংকটের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও উদ্বেগ
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, বন ধ্বংস করে জমি দখলের উদ্দেশ্যে বা পোড়া উদ্ভিদের অংশ সংগ্রহের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়। অনেক সময় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় জ্বলন্ত সিগারেটের উচ্ছিষ্ট বনে ফেলে দেওয়ায়ও আগুন লাগে। মাওনা গ্রামের ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘এভাবে আগুন দেওয়ার ফলে বনভূমির সৌন্দর্য নষ্ট হয় এবং নতুন করে জমি দখলের পথ তৈরি হয়। আগুন নেভাতে তেমন কোনো কার্যকর তৎপরতা দেখা যায় না।’
সিমলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান যোগ করেন, ‘আগুনের পর বিশাল এলাকা ছাইয়ে ঢেকে যায়। অনেক ছোট গাছ নষ্ট হয়ে যায়, এমনকি বড় গজারিগাছও মারা যায়। এসব আগুন নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নিতে হবে।’
বন বিভাগ ও পরিবেশবিদদের প্রতিক্রিয়া
বন বিভাগের শ্রীপুরের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো আমরা বনে টহল বৃদ্ধি করেছি। ফায়ারলাইন তৈরি করছি, স্থানীয়দের সচেতন করতে মাইকিং করা হচ্ছে এবং মসজিদে এ বিষয়ে বলা হচ্ছে। কিছু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রও কেনা হয়েছে। বড় আকারের আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস সহযোগিতা করে। তবে এ ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা খুব জরুরি। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘ভাওয়াল বনাঞ্চলের প্রাণীবৈচিত্র্য ধ্বংসের অন্যতম কারণ বনে আগুন দেওয়া। এতে ছোট কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বড় প্রাণীও মারা যায়। অনেক প্রাণী লোকালয়ে চলে এসে মানুষের হাতে মারা পড়ে। এগুলো বন্ধ করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’
বিন্দুবাড়ি গ্রামের মো. লিয়াকত বলেন, শীতের শেষের দিকে বনে আগুন বেশি দেখা যায়, এবং বৃষ্টি হলে তা নিভে যায়। তবে রোদে মাটি শুকিয়ে গেলে আবার আগুন জ্বলা শুরু হয়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।



