হাকালুকি হাওরে জলচর পাখির সংখ্যা বেড়েছে, শুমারিতে ৫৪ হাজার ৪৮৬টি রেকর্ড
মৌলভীবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন হাকালুকি হাওরে এবার জলচর পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের একটি দল পরিচালিত শুমারিতে ৫৩ প্রজাতির মোট ৫৪ হাজার ৪৮৬টি পাখি গণনা করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় একটি ইতিবাচক প্রবণতা নির্দেশ করে।
শুমারির বিস্তারিত ফলাফল
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও বন্য প্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপু জানিয়েছেন, গত ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি হাকালুকি হাওরের ৪৩টি বিলে ১২ সদস্যের একটি দল পাখিশুমারি চালায়। এতে সহযোগিতা করেছে বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএস-নবপল্লব। শুমারি অনুযায়ী, পাওয়া পাখিদের মধ্যে ১৮টি স্থানীয় ও ৩৫টি পরিযায়ী প্রজাতি রয়েছে।
গত বছর একই হাওরে ৬০ প্রজাতির ৩৫ হাজার ২৬৮টি পাখি রেকর্ড করা হয়েছিল, যা এবারের সংখ্যার চেয়ে কম। সীমান্ত দীপু উল্লেখ করেন, এবার হাওরের চিনাউরা, হাওরখালসহ কয়েকটি বিলের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল এবং সেখানে পর্যাপ্ত পানি থাকায় পাখিগুলো আকৃষ্ট হয়েছে। অন্য হাওরে পানি কমে যাওয়ায় এখানে পাখির আগমন বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাখি শিকার হ্রাস ও পরিবেশগত উন্নতি
পূর্ববর্তী বছরগুলোতে হাকালুকি হাওরে পাখি শিকারের ঘটনা সাধারণ ছিল, যেমন নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল বা বিষটোপের ব্যবহার। গত বছর শুমারিকালে নাগুয়া-লরিবাই বিলে প্রায় ১০০ মিটার লম্বা জাল পাওয়া গিয়েছিল, যাতে আটকে দুটি টিমেঙ্কের চাপাখি মারা যায়। এছাড়া পিংলা বিলের পাশে কার্বোটাফ নামক রাসায়নিক কীটনাশকের প্যাকেটও উদ্ধার করা হয়েছিল।
কিন্তু এবারের শুমারিতে এমন কোনো ঘটনা দেখা যায়নি। সীমান্ত দীপু দাবি করেন, আগে প্রায় প্রতিবছর ৪০ থেকে ৫০টি মৃত পাখি মিলত, কিন্তু এবার তা মেলেনি। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট বিল ব্যবস্থাপনায় থাকা প্রতিষ্ঠানের নজরদারির কারণে শিকারিদের অপতৎপরতা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
হাকালুকি হাওরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৯৯ সালে সরকার হাকালুকি হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। ২০২৪ সালে কোনো শুমারি না হলেও, গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়:
- ২০২৩ সালে: ৫২ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৭৭৮টি পাখি
- ২০২২ সালে: ৫১ প্রজাতির ৩৬ হাজার ৫০১টি পাখি
- ২০২১ সালে: ৪৫ প্রজাতির ২৪ হাজার ৫৫১টি পাখি
- ২০২০ সালে: ৫৩ প্রজাতির ৪০ হাজার ১২৬টি পাখি
এই তথ্যগুলো হাওরে পাখির সংখ্যার ওঠানামা এবং সাম্প্রতিক বৃদ্ধির ধারা তুলে ধরে।
হাকালুকি হাওরের ভৌগোলিক অবস্থান ও গুরুত্ব
হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এর আয়তন প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর, যা দেশের বৃহত্তম হাওর হিসেবে পরিচিত। এই হাওরটি জলচর পাখির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এর ভূমিকা অপরিসীম।
সামগ্রিকভাবে, এবারের শুমারি হাকালুকি হাওরে পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিকার হ্রাসের একটি আশাব্যঞ্জক চিত্র উপস্থাপন করেছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায় ও কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



