নেত্রকোনার হাওড়ে বিষ প্রয়োগে কোটি টাকার মাছ নিধন, জীববৈচিত্র্য হুমকিতে
হাওড়ে বিষ প্রয়োগে মাছ নিধন, জীববৈচিত্র্য হুমকিতে

নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলে জলাশয়ে বিষ প্রয়োগের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অপরাধমূলক কার্যক্রমের ফলে কোটি কোটি টাকার মাছ নষ্ট হচ্ছে এবং জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় জেলে ও মৎস্য খামারিরা জানিয়েছেন, অব্যাহত এমন পরিস্থিতি তাদের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলেছে।

হাওড়াঞ্চলের পরিবর্তিত চিত্র

জেলার বিস্তীর্ণ হাওড় এলাকা এক সময় মাছের প্রাচুর্যের জন্য সুপরিচিত ছিল। বর্ষা মৌসুমে এসব জলাশয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের আধিক্য দেখা যেত; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলে গেছে। বিভিন্ন জলাশয়ে অসংখ্য মৃত মাছ ভেসে উঠছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

অসাধু চক্রের কার্যক্রম

অভিযোগ রয়েছে, একটি অসাধু চক্র রাতের আঁধারে জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধন করছে। পরে মৃত মাছ সংগ্রহ করে তা বাজারজাত করা হচ্ছে। এতে শুধু মাছই নয়, জলাশয়ের অন্যান্য প্রাণীও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলজ উদ্ভিদ ও অণুজীব ধ্বংস হওয়ায় পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থাই বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার ঘুনা মরা ধনু নদীর জলাশয়ে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় জেলেরা প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকায় জলাশয়টি ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছিলেন। কয়েক দিন আগে সেখানে বিষ প্রয়োগের ফলে প্রায় দেড় কোটি টাকার মাছ মারা যায়।

রসূরপুর-জগন্নাথ মিলন মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি রেজাউল কবীর বলেন, "উপজেলার ঘুনা মরা ধনু নদী ইজারা নিয়েছিলাম; কিন্তু হঠাৎ এক রাতে ফিসারিতে বিষ প্রয়োগে কোটি টাকার মাছ মেরে ফেলছে। পরে মাছ তুলে মাটিচাপা দিতে হয়েছে। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে থানায় জিডি করেছিলাম; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্ষতিগ্রস্ত ফিসারি ব্যবসায়ী মো. আশরাফুর রহমান ও আবির হাসান নিলয় বলেন, "৮৬ লাখ টাকা দিয়ে তারা এক বছরের জন্য একটি ফিসারি লিজ নিয়েছিলেন। তাতে ঋণ করে মাছের খাবার, ঝাঁক দেওয়াসহ ৫৫ লাখ টাকা খরচ করেছেন; কিন্তু মাছ ধরার সময় হবার আগেই বিষ প্রয়োগে মাছ নিধন করা হয়েছে। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা কেমনে ইজারার টাকা দেব? কেমনে ঋণ শোধ করব জানি না। এক রাতের মধ্যেই তাদের সব বিনিয়োগ ধ্বংস হয়ে গেছে।"

প্রশাসনের পদক্ষেপ

শুধু এই একটি জলাশয় নয়, হাওড়াঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জেলে ও মৎস্য খামারিরা বলছেন, তারা বারবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না।

মাছ নিধনের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, "এ ধরনের ঘটনায় ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"

তিনি আরও জানান, নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, "হাওড়াঞ্চলে কিছু কিছু ফিসারিতে বিষ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে। তবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসন মিলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হয়। জলাশয়গুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।"

জনপ্রতিনিধিদের উদ্বেগ

এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নেত্রকোনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, "হাওড়াঞ্চলের জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য ভর্তুকি বা সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে।"

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাশয়ে বিষ প্রয়োগের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে হাওড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। এতে শুধু মাছের উৎপাদন কমবে না, বরং পুরো জলজ প্রতিবেশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও।

পরিবেশবিদদের মতে, এ ধরনের অপরাধ দমনে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত উদ্যোগ। তারা মনে করেন, নিয়মিত নজরদারি, কঠোর শাস্তি এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

হাওড়ের ভবিষ্যৎ

হাওড়ের পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। অন্যথায়, এক সময় মাছের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চল তার স্বকীয়তা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেত্রকোনায় মৎস্য উৎপাদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জেলাটি প্রতি বছর ১ লাখ ৮ হাজার ৩৩৮ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করে, যার মধ্যে হাওড়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই উৎপাদনশীলতা রক্ষায় সমন্বিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সম্প্রদায়, প্রশাসন এবং পরিবেশবিদদের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া হাওড়াঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।