তীব্র দাবদাহে পুড়ছে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত। এই চরম গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে আম পান্না, মাঠার পাশাপাশি কাঁচা পেঁয়াজের মতো প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নানা ঘরোয়া উপাদানের দিকে ঝুঁকছেন সাধারণ মানুষ। তবে এসবের মধ্যে পেঁয়াজ খাওয়া নিয়ে জনমনে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ গরমের দিনে কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়াকে শরীরের জন্য দারুণ উপকারী মনে করলেও অনেকের ধারণা, এটি উল্টো গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বাড়াতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তীব্র তাপদাহের সময় আসলেই কি কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়া উচিত?
পেঁয়াজের ঐতিহ্য ও বিজ্ঞান
বহু প্রজন্ম ধরে ভারতীয় গ্রীষ্মের সঙ্গে পেঁয়াজের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বহু পরিবারে গরমের দিনে প্রতি বেলার খাবারের সঙ্গে কাটা পেঁয়াজ পরিবেশন করা হয়। বিশেষ করে গ্রাম ও ছোট শহরগুলোতে মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন যে পেঁয়াজ শরীরকে তীব্র গরম বাতাস থেকে রক্ষা করে। এই বিশ্বাসের কারণে অনেকেই গরমে ভ্রমণের সময় সঙ্গে পেঁয়াজ রাখেন। বিজ্ঞান হয়তো সব ঐতিহ্যবাহী প্রতিকারের পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারে না, তবে এই ধরনের চর্চাগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে রয়েছে।
রাজস্থানে পেঁয়াজ নিয়ে একটি বেশ আকর্ষণীয় ঐতিহ্যবাহী চর্চা রয়েছে। পুষ্টিবিদ রূপালী দত্ত বলেন, রাজস্থানের একটি ঐতিহ্য হলো, শরীর ঠান্ডা রাখতে মানুষ তাদের বুকে এবং কানের পেছনে বাটা পেঁয়াজ মালিশ করেন।
পেঁয়াজের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা
গরমের দিনে পেঁয়াজকে উপকারী ভাবার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর উচ্চ জলীয় অংশ। কাঁচা পেঁয়াজে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে, যা তীব্র গরমে শরীরে পানির জোগান দিতে সাহায্য করে। তাপমাত্রা বাড়লে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে অনবরত পানি বেরিয়ে যায়, আর তাই এই ধরনের জলীয় খাবার শরীরকে সতেজ রাখে।
পুষ্টিবিদ রূপালী দত্ত আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাশাস্ত্রে পেঁয়াজের একটি শীতলীকরণ প্রভাব রয়েছে। এতে কোয়ারসেটিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রিবায়োটিকস এবং প্রচুর পানি রয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কাঁচা পেঁয়াজ হিটস্ট্রোকের বিরুদ্ধে কোনও জাদুকরী সুরক্ষা নয়। এটি পুষ্টিগুণ ও পানির কারণে শরীরকে কিছুটা সাহায্য করতে পারে মাত্র, কিন্তু কখনোই পর্যাপ্ত পানি পানের বিকল্প হতে পারে না।
অতিরিক্ত কাঁচা পেঁয়াজ খেলে কী হয়?
কাঁচা পেঁয়াজ সবার শরীরের জন্য সমানভাবে সহ্য হয় না। কেউ কেউ এটি প্রতিদিন কোনও সমস্যা ছাড়াই খেতে পারেন, আবার অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়ার ফলে অ্যাসিডিটি, পেট ফাঁপা, গ্যাস বা বুক জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তীব্র তাপদাহের সময় এমনিতেই গরমের কারণে শরীর ক্লান্ত ও চাপে থাকে, তার ওপর হজমের এই অস্বস্তি পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলতে পারে।
মেডিকভার হসপিটালস-এর তথ্য অনুযায়ী, কাঁচা পেঁয়াজ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হলেও সংবেদনশীল পাকস্থলীর মানুষের ক্ষেত্রে এটি গ্যাস, পেট ফাঁপা, বুক জ্বালাপোড়া বা মুখের দুর্গন্ধের মতো মৃদু সমস্যা তৈরি করতে পারে। মূলত সমস্যাটি পেঁয়াজের নয়, বরং একেকজনের পরিপাকতন্ত্র এর প্রতি কীভাবে সাড়া দিচ্ছে সেটাই আসল। যারা আগে থেকেই অ্যাসিডিটি, অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা হজমের সমস্যায় ভুগছেন, কাঁচা পেঁয়াজ খেলে তাদের অস্বস্তি আরও বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি
বিজ্ঞানসম্মতভাবে কাঁচা পেঁয়াজ সরাসরি হিটস্ট্রোকের কারণ হওয়ার কোনও প্রমাণ নেই। তবে অতিরিক্ত পেঁয়াজ খাওয়ার ফলে যদি বমি বমি ভাব, অ্যাসিডিটি বা পেটের সমস্যা দেখা দেয়, তবে তা এই তীব্র গরমে একজন মানুষকে আরও বেশি অসুস্থ ও দুর্বল করে তুলবে।
সূত্র: এনডিটিভি



