ভিনগ্রহের গাছপালা কেমন হবে? সবুজ নয়, হতে পারে বেগুনি!
ভিনগ্রহের গাছপালা কেমন হবে? সবুজ নয়, বেগুনি!

এলিয়েনের ব্যাপারে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু শুনেছেন। রাতের আকাশে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে কখনো কি ভেবেছেন, ওই দূরের গ্রহগুলোতে কি জীবন আছে? মহাকাশবিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত সৌরজগতের বাইরে অসংখ্য গ্রহ আবিষ্কার করেছেন। এগুলোকে বলে এক্সোপ্ল্যানেট। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত গবেষণা করে দেখছেন, সৌরজগতের ভেতরে বা বাইরে কোন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। কিন্তু আপনার মনে কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে, যদি ওই সব গ্রহে সত্যিই গাছপালা থাকে, তবে সেগুলো দেখতে ঠিক কেমন হবে? পৃথিবীর মতো কি সেখানেও দিগন্তবিস্তৃত সবুজ বনানী দেখা যাবে, নাকি তাদের রূপ হবে সম্পূর্ণ অন্য রকম? বিজ্ঞান কিন্তু বলছে, ভিনগ্রহের গাছপালার চেহারা আমাদের চেনা পৃথিবীর চেয়ে একেবারে আলাদা হতে পারে। চলুন, এই রহস্যের গভীরে যাওয়া যাক।

রঙের রহস্য: সবুজ নয়, হতে পারে গাঢ় বেগুনি

পৃথিবীতে গাছপালার মূল কাজ সূর্যালোকের শক্তি ব্যবহার করে অজৈব পদার্থ থেকে জৈব পদার্থ তৈরি করা। এই প্রক্রিয়াকে আমরা সালোকসংশ্লেষণ বলে জানি। মহাবিশ্বের অন্যান্য গ্রহে যদি গাছপালা থাকে, তবে তাদের বেঁচে থাকার মৌলিক কৌশলও হয়তো এমনই হবে। কিন্তু একটা বড় পার্থক্য তৈরি করে দেবে সেখানকার নক্ষত্রের আলোর রং।

আপনি হয়তো জানেন, সূর্য হলো একটি হলুদ বামন নক্ষত্র। পৃথিবীর গাছপালা এই সূর্যের আলোর রঙের সঙ্গে নিজেদের চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে। এই মানিয়ে নেওয়ার কাজটি করে ক্লোরোফিল নামে একধরনের সবুজ রঞ্জক পদার্থ। ক্লোরোফিল সূর্যের আলো থেকে লাল এবং নীল রঙের আলো শোষণ করে নেয়, কিন্তু সবুজ রংকে প্রতিফলিত করে। ঠিক এ কারণেই পৃথিবীর বেশির ভাগ গাছপালা আমাদের চোখে সবুজ দেখায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে মহাবিশ্বের চিত্রটা একটু ভিন্ন। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বেশির ভাগ নক্ষত্রই কিন্তু সূর্যের মতো হলুদ নয়। এরা হলো লাল বামন নক্ষত্র। এই লাল বামন নক্ষত্রগুলো থেকে যে আলো বের হয়, তাতে ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মির অনুপাত অনেক বেশি থাকে। এখন কোনো এক্সোপ্ল্যানেট যদি এমন কোনো লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে, তাহলে সেখানকার গাছপালাকে সেই ইনফ্রারেড আলোর সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হবে। ফলে সেই গ্রহের গাছপালার রঞ্জক পদার্থগুলো পৃথিবীর মতো সবুজ না হয়ে গাঢ় বেগুনি রঙের হতে পারে! শুনতে অবাক লাগলেও, খোদ পৃথিবীতেই এর প্রমাণ রয়েছে। পৃথিবীতেই এমন কিছু বিশেষ ধরনের নীলাভ-সবুজ শৈবাল আছে, যারা সালোকসংশ্লেষণের জন্য এই অবলোহিত আলো ব্যবহার করতে পারে। সুতরাং, ভিনগ্রহের বনভূমি বেগুনি রঙের হওয়াটা মোটেও আশ্চর্যের কিছু নয়।

অভিকর্ষের জাদু: উদ্ভিদ আকাশচুম্বী হবে নাকি ছোট

শুধু নক্ষত্রের আলোই নয়, একটি গ্রহের অভিকর্ষ বলও সেখানকার গাছপালার চেহারা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়। অভিকর্ষের ওপর নির্ভর করে গাছের উচ্চতা এবং কাঠিন্য। আপনি যদি এমন কোনো গ্রহে যান, যার অভিকর্ষ শক্তি পৃথিবীর চেয়ে অনেক দুর্বল, তাহলে সেখানে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পাবেন। দুর্বল টানের কারণে সেখানকার গাছগুলো বিনা বাধায় অনেক ওপর পর্যন্ত বেড়ে উঠবে। সেই গ্রহের গাছগুলো হবে অতিকায় লম্বা।

উল্টো দিকে, গ্রহটির অভিকর্ষ শক্তি যদি পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়, তাহলে গাছগুলো ওপরের দিকে বাড়তেই পারবে না। প্রবল অভিকর্ষ বলের কারণে গাছগুলো হবে অনেক খাটো, চারদিকে চওড়া এবং মাটির সঙ্গে প্রায় লেপ্টে থাকা চ্যাপ্টা আকৃতির।

বায়ুমণ্ডলের ঢাল এবং বেঁচে থাকার লড়াই

বায়ুমণ্ডলের উপাদান এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণও এক্সোপ্ল্যানেটের গাছপালার গঠন ও জীববিজ্ঞানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। ধরুন, এমন একটি গ্রহের কথা, যেখানে পৃথিবীর মতো সুরক্ষামূলক কোনো ওজোন স্তর নেই। ওজোন স্তর না থাকার মানে হলো, সেই গ্রহে নক্ষত্র থেকে প্রচুর ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি আছড়ে পড়বে।

এই মারাত্মক রেডিয়েশন থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্য সেই গ্রহের গাছপালা হয়তো এক অদ্ভুত কৌশল বেছে নেবে। তাদের পাতাগুলোর ওপরিভাগ হতে পারে আয়নার মতো চকচকে প্রতিফলক, যা অতিবেগুনি রশ্মিকে সহজেই ফিরিয়ে দেবে। অথবা রেডিয়েশন ঠেকাতে তারা নিজেদের শরীরে অতিরিক্ত কোনো সুরক্ষামূলক রঞ্জক পদার্থ তৈরি করে নেবে।

খাবারের উপাদানের ক্ষেত্রেও আসতে পারে বড় পরিবর্তন। পৃথিবীর গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে তাদের প্রয়োজনীয় কার্বনের চাহিদা মেটায়। কিন্তু যদি ওই ভিনগ্রহের বায়ুমণ্ডলে কোনো কার্বন ডাই-অক্সাইড না থাকে, তখন কী হবে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন পরিবেশে টিকে থাকতে হলে গাছগুলোকে ভিন্ন কোনো পথ খুঁজতে হবে। তারা হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো প্রক্রিয়ায় এবং অভিনব উপায়ে মিথেন গ্যাস থেকে তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন সংগ্রহ করে নেবে।

শেষ কথা

মহাবিশ্বের বৈচিত্র্যের কোনো শেষ নেই। নক্ষত্রের আলো, বায়ুমণ্ডল ও অভিকর্ষ—এই তিনটি বিষয় মিলেই মূলত ভিনগ্রহের গাছপালার আসল রূপ ঠিক করে দেবে। হলুদ সূর্যের আলোয় যেমন সবুজ গাছ জন্মায়, তেমনি লাল নক্ষত্রের আলোয় হয়তো জন্ম নেবে গাঢ় বেগুনি গাছ। আবার দুর্বল ওজোন স্তরের কারণে হয়তো গাছের পাতায় দেখা যাবে আয়নার মতো চকচকে আবরণ। তাই অন্য কোনো গ্রহে যদি কখনো প্রাণের বা উদ্ভিদের সন্ধান মেলে, তাহলে তা যে আমাদের চেনা জগতের কল্পনাকেও হার মানাবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সূত্র: সায়েন্স ইলাস্ট্রেটেড