আল্লাহর সান্নিধ্যের ব্যাকুলতা: আধ্যাত্মিক উন্নতির উচ্চস্তর
আল্লাহর সান্নিধ্যের ব্যাকুলতা: আধ্যাত্মিক উন্নতির স্তর

মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার বীজ অঙ্কুরিত হলে জন্ম নেয় এক পবিত্র তৃষ্ণার—যাকে বলা হয় ‘শওক’ বা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতা। এই ব্যাকুলতা শুধু তাদের ভাগ্যে জোটে, যাদের একটি জীবন্ত অন্তর আছে।

ব্যাকুলতার স্বরূপ

আল্লাহর প্রতি ব্যাকুলতা মুমিনের আধ্যাত্মিক উন্নতির এক সুউচ্চ স্তর। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলির মতে, আল্লাহর প্রতি গভীর ও প্রবল ভালোবাসা থেকেই এই ব্যাকুলতার জন্ম হয়। নবীজি (সা.) আল্লাহর কাছে এই মহান স্তরের প্রার্থনা করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আপনার সাক্ষাতের আনন্দ এবং আপনার সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতা প্রার্থনা করছি।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৩২৫)

ব্যাকুলতা অর্জনের প্রথম শর্ত আল্লাহকে চেনা, যাকে বলে ‘মারেফাত’। যখন মানুষের অন্তর্দৃষ্টি প্রসারিত হয়, তখন সে বিপদের মাঝেও আল্লাহর দান দেখতে পায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মৃত্যু: প্রভুর কাছে ফেরার সেতু

সাধারণ মানুষের কাছে মৃত্যু আতঙ্কের বিষয় হলেও আল্লাহর ব্যাকুল প্রেমিকদের কাছে এটি এক শুভক্ষণ। মুয়াজ্জিন হজরত বেলাল (রা.) যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন তাঁর স্ত্রী ব্যথিত হয়ে বলছিলেন, ‘হায় আফসোস!’ কিন্তু বেলাল পরম আনন্দে বলে উঠলেন, ‘আহা, কী আনন্দ, কালই আমি আমার প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হব—নবীজি ও তাঁর দলের সঙ্গে।’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১০৩, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৭)

ব্যাকুলতার ফলাফল

ইমাম ইবনুল কাইয়িমের মতে, এই ব্যাকুলতা হলো ভালোবাসার ফল। এর মাধ্যমে বান্দা তার প্রতিপালকের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং তাঁর জিকিরে এক অনাবিল প্রশান্তি খুঁজে পায়। এই ব্যাকুলতা মুমিনের মনে এতটাই প্রবল হয় যে জান্নাতে আল্লাহর দর্শন লাভ না করা পর্যন্ত তার হৃদয় স্থির হয় না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নবী ইউসুফ (আ.)-এর জীবনে আমরা এই ব্যাকুলতার অনন্য নজির দেখি। তিনি যখন কূপের অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হন, তখন কিন্তু মৃত্যু চাননি। যখন মিথ্যা অপবাদে কারাগারে গেলেন, তখনো বলেননি ‘আমাকে তুলে নাও’। কিন্তু যখন তিনি রাজত্ব পেলেন, পরিবারকে ফিরে পেলেন এবং নেয়ামত পূর্ণ হলো, তখন তিনি ব্যাকুল হয়ে প্রতিপালকের সান্নিধ্য চাইলেন।

সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর প্রার্থনা স্মরণীয়: ‘হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, আপনিই ইহকাল ও পরকালে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১০১)

নির্জনে আত্মিক কথোপকথন

আল্লাহর প্রেমিকরা মানুষের ভিড়ে থাকলেও তাঁরা নির্জনতা ভালোবাসেন, যাতে একান্তে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা যায়। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার জীবনের শুরুতে এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছিল যে তিনি মাঝেমধ্যে লোকালয় ছেড়ে মরুভূমিতে চলে যেতেন এবং একান্তে আল্লাহর সঙ্গে মোনাজাত করতেন। (ইবনুল কাইয়িম, মাদারিজুস সালিকিন, ৩/৯৪, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৬)

নবী ঈসা (আ.) তাঁর শিষ্যদের বলতেন, ‘তোমরা আল্লাহর সঙ্গে বেশি কথা বলো, মানুষের সঙ্গে কম।’ শিষ্যরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীভাবে আল্লাহর সঙ্গে বেশি কথা বলব?’ তিনি বললেন, ‘তাঁর স্মরণে নির্জনে বসো, তাঁর নেয়ামত নিয়ে ভাবো এবং একান্তে তাঁর কাছে মিনতি করো।’

দুনিয়াকে পরকালের বাহন বানানো

সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবালের মৃত্যুর মুহূর্তটি ছিল আবেগময়। সেদিন সকালে তিনি মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি জানেন যে আমি দুনিয়াকে ভালোবাসিনি নদী খনন করতে বা গাছ লাগাতে; বরং আমি দুনিয়াতে বেঁচে থাকতে চেয়েছি গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণার্ত থেকে রোজা রাখতে, রাতের দীর্ঘ ইবাদতের কষ্ট সহ্য করতে আর ইলমের মজলিসে আলেমদের সান্নিধ্যে হাঁটু গেড়ে বসতে।’ (আবু নুয়াইম আসফাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া, ১/২২৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৮)

মুমিনের কাছে প্রতিটি দিন ও রাত হলো ইবাদতের প্রতিযোগিতার মাঠ। তারা দুনিয়াকে শুধু পরকালের পাথেয় সংগ্রহের মাধ্যম মনে করে। তাদের লক্ষ্য থাকে মহান আল্লাহর সেই ঘোষণা, ‘তোমরা নিজেদের জন্য অগ্রিম পাথেয় প্রেরণ করো, আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রেখো যে তোমরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। আর মুমিনদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২৩)

আত্মার যত্ন নেওয়া

ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘একজন আবেদ বা উপাসকের জন্য জান্নাতের সুশীতল ছায়া ছাড়া কোথাও বিশ্রামের জায়গা নেই। আর একজন প্রেমিকের জন্য জান্নাতে আল্লাহর দিদার ছাড়া কোথাও স্বস্তি নেই।’ (ইবনুল কাইয়িম, আল-ফাওয়ায়িদ, ১/৪২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৭৩)

এই উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম। শরীরের চেয়ে যখন আত্মার যত্ন বেশি নেওয়া হয়, তখন আত্মা হালকা হয়ে যায় এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য ছটফট করতে থাকে। কিন্তু শরীর যখন ভোগ-বিলাস আর অলসতায় ডুবে থাকে, তখন আত্মা স্থবির হয়ে পড়ে এবং পার্থিব মোহে আবদ্ধ হয়। আল্লাহকে পাওয়ার ব্যাকুলতাই মুমিনকে পাপাচার থেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহর আনুগত্যে পরম স্বাদ দান করে। কেননা, মুমিন বিশ্বাস করে দিনশেষে প্রতিটি প্রাণকেই তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।