রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’: নারীবাদী বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়ার কালজয়ী রচনা
রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’: নারীবাদী বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়া

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ‘সুলতানার স্বপ্ন’: নারীবাদী বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়ার কালজয়ী রচনা

বাংলা সাহিত্যে নারীবাদী ও বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়ার এক অসাধারণ সংমিশ্রণ হলো রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ‘সুলতানার স্বপ্ন’। এই গ্রন্থটি গোটা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে এবং বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়ার চিন্তাধারার উজ্জ্বল প্রতিফলন। ১৯০৫ সালে প্রথম প্রকাশিত এই রচনা মাদ্রাজের ‘দ্য ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিন’-এ ইংরেজিতে প্রকাশ পায়, পরে ১৯০৮ সালে পুস্তিকা আকারে এবং ১৯২২ সালে ‘মতিচূর ২য় খণ্ড’-এ বাংলায় প্রকাশিত হয়।

নারীবাদী ও বৈজ্ঞানিক দর্শনের মেলবন্ধন

‘সুলতানার স্বপ্ন’ নারীমুক্তি আন্দোলন ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজের পক্ষে এবং ঔপনিবেশিক পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত ইশতেহার। এই স্বপ্ন-আখ্যানের মাধ্যমে রোকেয়া তাঁর সময়ের ভারতীয় নারীত্বের রুদ্ধশ্বাস বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের জন্য বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। গ্রন্থটি সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব, বিজ্ঞান ও নারীবাদের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে একটি যুগান্তকারী চিন্তাধারার বীজ রোপণ করেছিল।

রোকেয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চাই মানবমুক্তির একমাত্র পথ এবং সমাজকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি। তাঁর এই স্বপ্ন-আখ্যান আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, অনুপ্রেরণাদায়ক এবং বৈজ্ঞানিক কল্পনার এক বিস্ময়কর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘নারীস্থান’-এর কল্পনালোক

রোকেয়ার ইউটোপিয়ার প্রধান তত্ত্ব হলো ‘নারীস্থান’ বা ‘লেডিল্যান্ড’, যেখানে নারীরা সর্বময় কর্তৃত্বে আসীন এবং পুরুষেরা কঠোরভাবে অন্তঃপুরবাসী। এই চিত্রায়ন ছিল শত শত বছর ধরে নারীদের ওপর চাপানো ‘জেনানা’ প্রথার অসারতা বোঝানোর জন্য এক সরাসরি ও প্রতীকী প্রতিবাদ। সিস্টার সারার উক্তি, ‘এই পরিবর্তনের পূর্বে আমরাও আপনাদের মতো কঠোর অবরোধবন্দিনী থাকিতাম,’ যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অযৌক্তিকতার প্রতি কটাক্ষ করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রোকেয়া যখন ‘সুলতানার স্বপ্ন’ রচনা করেন, তখন বাংলার মুসলিম সমাজ ছিল এক কঠোর অবরোধের কারাগারে। নারীদের জীবন আবর্তিত হতো পর্দাপ্রথা, জেনানা ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক শৃঙ্খলের নিগড়ে। শিক্ষা ছিল প্রায় নিষিদ্ধ এবং পুরুষের কর্তৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। রোকেয়া নিজে এই অন্ধকারাচ্ছন্ন বাস্তবতার শিকার ছিলেন, যা থেকে জন্ম নেয় এই সাহসী কল্পনালোক।

বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা ও প্রযুক্তি কল্পনা

রোকেয়ার অসাধারণ দূরদর্শী বিজ্ঞানচিন্তা গ্রন্থটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি এমন সব প্রযুক্তির কল্পনা করেছিলেন, যা তাঁর সময়ের জন্য ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয়। নারীস্থানে সূর্যতাপ সংগ্রাহক যন্ত্র ও সৌরচুল্লি ব্যবহার করে রান্না হয় এবং ঘর গরম রাখা হয়, যা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শক্তির ব্যবহারের এক প্রারম্ভিক দর্শন দেয়।

রোকেয়ার কল্পিত হাইড্রোজেন বলের সাহায্যে অভিকর্ষ বল প্রতিহতকারী বায়ুযান ছিল এক যুগান্তকারী ধারণা, যা রাইট ভাইদের প্রথম সফল উড়ানের মাত্র দুই বছর পরে রচিত। নারীস্থানের মহিলারা কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানোর জন্য ‘ক্লাউড কনডেন্সার’ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, যা আধুনিক ‘ক্লাউড সিডিং’-এর ধারণাকে এক শতাব্দী আগেই তুলে ধরে।

সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

সাহিত্য সমালোচকেরা এই রচনাকে পৃথিবীর প্রথম দিককার নারীবাদী সায়েন্স ফিকশন হিসেবে বিবেচনা করেন। এটি চার্লট পারকিনস গিলম্যানের ‘হারল্যান্ড’-এর প্রায় এক দশক আগে প্রকাশিত হয়, যা প্রমাণ করে রোকেয়া ছিলেন মননশীল ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘নারী’ গ্রন্থে এটিকে ‘বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়া’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

২০২৪ সালে গ্রন্থটি ইউনেস্কোর এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত হয়, যা এর গভীর সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুরুত্বের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। এটি প্রমাণ করে রোকেয়ার লেখাটি স্থানীয় সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে এক যুগান্তকারী দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার প্রতিফলন

যেকোনো ইউটোপিয়ার মতোই, ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এ কিছু বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। নারীস্থানের সমাজটি এতটাই নিখুঁতভাবে চিত্রিত যে এখানে শ্রেণি, ধর্ম, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বা আর্থসামাজিক দ্বন্দ্বের মতো বাস্তব সমস্যাগুলো অনুপস্থিত। তবে এটি রোকেয়ার দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে নির্মিত এক প্রতীকী জগৎ, যা বাস্তবের অসমতাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যই তৈরি।

গ্রন্থটির যৌক্তিক সীমাবদ্ধতাগুলো সত্ত্বেও এর সাহিত্যিক বা দার্শনিক গুরুত্ব একবিন্দুও ক্ষুণ্ন করে না। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ শুধু বাস্তব সমাজের নকশা নয়, বরং বাস্তবতার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক কল্পনামূলক ও জোরালো প্রতিবাদ। রোকেয়ার এই রচনা কেবল সেকালের নারীদের নয়, বরং সব যুগে সব মানুষের জন্য একটি ন্যায়, সাম্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে অমলিন থাকবে।