রামিসা হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিলেন বাবা-মা, আদালতে কান্নাজড়িত বর্ণনা
রামিসা হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিলেন বাবা-মা, আদালতে কান্না

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন নিহত শিশুর মা পারভীন আক্তার। জবানবন্দি শেষে আসামি পক্ষের আইনজীবী তাকে জব্দ তালিকায় নেওয়া তার স্বাক্ষরটি দেখিয়ে নিশ্চিত হতে বললে তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে তা নিজের স্বাক্ষর বলে নিশ্চিত করেন।

আদালতে সাক্ষ্য

দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করা এই শিশু হত্যা মামলায় মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং মা পারভীন আক্তার। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ডকে দাঁড়িয়ে বারবার আবেগাপ্লুত ও জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হলে আদালতের পক্ষ থেকে তাদের বসার জন্য চেয়ার দেওয়া হয়।

এদিন কড়া নিরাপত্তায় মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আদালতে হাজির করা হয়। সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে প্রথমে সাক্ষ্য দিতে আসেন মামলার বাদী ও নিহত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাবার জবানবন্দি

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, “সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমি বনানীর কাকলীর অফিসে যাওয়ার পর আমার স্ত্রী ফোন দিয়ে জানান, রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি দ্রুত বাসে করে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে বাসায় ফিরে আসি। এসে দেখি ফ্ল্যাটের সামনে অনেক লোক। আমার স্ত্রী বলতে থাকেন, পাশের ফ্ল্যাটে রামিসা আটকে আছে। আমি দৌঁড়ে নিচে গিয়ে একটা হাতুড়ি নিয়ে আসি এবং অন্য লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে ২০-২৫ মিনিট চেষ্টা করে দরজার তালা ভাঙি।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি আরও জানান, তালা ভাঙার পর ছিদ্র দিয়ে ভেতরে আসামি স্বপ্নাকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভেতরে ঢুকে তারা টয়লেটের মেঝেতে রক্ত দেখতে পান। এরপর শয়নকক্ষের স্টিলের খাট উচু করতেই বালতির ভেতর রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পেয়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ তাকে জেরা করেন। জেরায় পূর্বশত্রুতার জেরে এই মামলা করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বাদী বলেন, “আসামিকে আমি জীবনেও দেখিনি, মিথ্যা অভিযোগের প্রশ্নই আসে না।”

মায়ের জবানবন্দি

সকাল ১১টা ২ মিনিটে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে শপথ নেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। আদালত ঘটনার তারিখ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ঘটনাটি ছিল ১৯ তারিখের।” ঘটনার দিন তিনি বাসায় রান্না করছিলেন এবং রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। তার দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে রাইসা আক্তার তার চাচা মোস্তফার বাসায় যেতে চায়। তখন ছোট মেয়ে রামিসাও তার সঙ্গে যেতে চাইলে রামিসাকে বারণ করেন। পরে শুনতে পান ওরা দুজনেই রেডি হচ্ছে। এক পর্যায়ে বড় মেয়ে চলে গেলেও সে রামিসাকে সঙ্গে নেয়নি। মা তখন বুঝতে পারেননি যে রামিসাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কিনা।

পারভীন আক্তার আদালতে জানান, এর কিছুক্ষণ পর তিনি পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটি বাচ্চার চিৎকারের শব্দ পান। ভেবেছিলেন পাশের বাসায় একটা বাচ্চা আছে তার শব্দ। তারা যে নেই তার মনে ছিল না। এর ৩-৪ মিনিট পর বড় মেয়ে রাইসা বাসায় একা ফিরে আসে। মেয়েকে একা দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তুমি একা কেন? রামিসা কোথায়?” রাইসা জবাবে বলে, “রামিসা তো চাচার বাসায় যায়নি।” এরপর রামিসাকে না পেয়ে তিনি চারদিকে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে থাকেন এবং লোকজনকে বলেন রামিসাকে দেখেছেন কিনা। কিন্তু সবাই বলে কেউ দেখেনি। রামিসার একটি বিড়াল ছিল, তাই সে নিচে গেছে ভেবে নিচেও খোঁজ নেন। কিন্তু নিচের অফিসের লোকজনের ভেতরে খুঁজেও তাকে পাননি। এরপর দোতলার ব্যাচেলর বাসায় খোঁজ নেন, সেখানেও পাননি। তারপর তিন তলায় ধাক্কাধাক্কি করি তারা খুলে না। নিচের দিকে তাকায় দেখি আমার মেয়ের একটা জুতা। অনেক জোড়ে ধাক্কাধাক্কি করি, চার তলা থেকে স্বামী-স্ত্রী আসে। পাঁচ তলা থেকে আসমা নামে একজন আছে। সবাই ধাক্কাধাক্কি করি কিন্তু খুলতে পারি নাই।

তিনি আরও জানান, তারপর মনিকে বলি আপনি নিচে যান লোকজন নিয়ে আসেন। এরপর ১০-১২ জন আসে। আমার স্বামীকে কল দিতে থাকি, সে বলে খুঁজতে থাকো। লোকজন জড়ো হলে আমার স্বামীও আসে। কে জানি লক ভেঙে ফেলে। বাথরুমের সামনে অনেক রক্ত দেখি। স্বপ্নাকে দেখি হাটাহাটি করতে। রাজু নামে একজন ভিডিও করে। ভিতরে ঢুকে দেখি আমার মেয়ের দেহ এক জায়গায় মাথা আরেক জায়গায়।

তিনি বলেন, “আমি তাকে অনেকবার বলেছি বোন দরজাটা খুলে দে, তোর কিছু হবে না। সে দরজা খুলে নাই। এরপর পুলিশ এসে রামিসার জামাকাপড়সহ যাবতীয় আলামত জব্দ করে।”

ক্যামেরা ট্রায়ালে বড় বোনের জবানবন্দি

নিহত রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তার শিশু হওয়ায় এদিন সাধারণ এজলাসের পরিবর্তে বিশেষ ব্যবস্থায় ‘ক্যামেরা ট্রায়াল’-এর মাধ্যমে তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন আদালত। জানা গেছে, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আগামীকালও এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম ও অন্যান্য সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ অব্যাহত থাকবে। এই মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা ও প্রতিবেশীসহ মোট ১৭ জনকে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী করা হয়েছে।

মামলার পটভূমি

এর আগে গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন এবং গত সোমবার আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়।

মামলার সূত্রে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে রুমের ভেতরে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। ডাকাডাকির পর কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়নগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতারে সক্ষম হয় পুলিশ।

এই ঘটনায় ২০ মে ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।