ফেনীর প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি: কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন
ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামে অবস্থিত প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি আজ প্রতাপহীন। একসময়ের রাজকীয় প্রাসাদ এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সংস্কারহীনতায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। রাজাও নেই, মসনদ নেই, নেই কোলাহল ও বসতি। ভূমি খেকো সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে এই ঐতিহাসিক স্থানটি এখন ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
বাংলা ১২২৮ সালের ১৩ ফাল্গুন রামনাথ কৃষ্ণ সাহা এই জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গায় নির্মিত এই রাজপ্রসাদসম বাড়িতে রয়েছে পাঁচটি অভিজাত ডিজাইনের দ্বিতল ভবন। স্থানীয়দের কাছে এটি বড়বাড়ি বা রাজবাড়ি নামে পরিচিত। জমিদাররা এখানে ১২টি পুকুর খনন করেছিলেন, যেখানে মাছ চাষ হতো এবং পাঁচটি দৃষ্টিনন্দন বৈঠকখানাবেষ্টিত ঘাটলায় পরিবারের সদস্যরা গোসল ও আড্ডা দিতেন।
১৯৫০ সালে জমিদার প্রথা বিলুপ্তির পরও পরিবারটি ২০০২ সাল পর্যন্ত এ বাড়িতে বসবাস করত। তবে ১৯৯৮ সালের দিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে, যা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে। নিরাপত্তার অভাব, ব্যবসায়িক ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, ভারতের ত্রিপুরা ও কলকাতায় চলে যান।
পর্যটকদের আকর্ষণ ও চ্যালেঞ্জ
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এই জমিদার বাড়ি দেখতে আসেন। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। তবে নিরাপত্তা, শৌচাগার ও বৈদ্যুতিক বাল্বের অভাবের কারণে সন্ধ্যার আগেই তাদের বাড়ি ছাড়তে হয়। দীর্ঘদিন সংস্কারহীনতা ও পরিচ্ছন্নতার অভাবে বাড়িটি ক্রমেই তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বাড়িটি মাদক সেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে এবং উঠতি বয়সী যুবতীরা হেনস্থার শিকার হন। প্রতি বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনদিনব্যাপী উৎসবে হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে, কিন্তু মেলা শেষে আবারও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে বাড়িটি।
প্রশাসনের ভূমিকা ও সংরক্ষণের দাবি
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাহীদুল ইসলাম জানান, বাড়িটি এখনও ব্যক্তিমালিকানায় রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই স্থান সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসনের তীক্ষ্ণ নজরদারি আছে, কিন্তু আইনি বাধ্যবাদকতার কারণে সংস্কার ও পর্যটন বান্ধব পরিকল্পনা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম নোমান বলেন, তার যোগদানের পর বাড়িতে বখাটেদের আড্ডা কমেছে এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। তবে বাড়িটি সেকাল ও একালের কালের সাক্ষী হয়ে আছে।
পর্যটকরা দাবি করেন, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা এই ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ করা জরুরি। দ্রুত বাংলার জমিদারি প্রথার নিদর্শন হিসেবে বাড়িটি সংস্কার করে পর্যটন বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে।



