জাতীয় সংস্কৃতিচর্চা না থাকলে ইতিহাস ভুলে যাবে: রুহুল কবির রিজভী
বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিক চর্চা অব্যাহত না রাখলে জাতি তার ইতিহাস ও শেকড় হারিয়ে ফেলবে বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সংস্কৃতির ভূমিকা
রিজভী বলেন, 'আমরা যে গণতন্ত্রের জন্য ১৬-১৭ বছর লড়াই করেছি, সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। শুদ্ধ ঈশ্বরপ্রেম, মানবিক প্রেম, আধ্যাত্মিকতার ভাবনা ও লোকজ সাহিত্যের ধারাবাহিক অনুশীলন না থাকলে আমরা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ভুলে যাব।' তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা না থাকলে জাতির অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব ও প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতা
রুহুল কবির রিজভী পহেলা বৈশাখকে বাংলাদেশের অন্যতম নিজস্ব উৎসব হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি বলেন, 'আগে এটি মূলত গ্রামীণ উৎসব হিসেবে পালিত হলেও বর্তমানে শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও এর বিস্তৃতি ঘটছে। একসময় হালখাতার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করতেন এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী জীবনযাপন করত। কিন্তু বর্তমানে নতুন প্রজন্ম বাংলা সাল ও পঞ্জিকার সঙ্গে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।'
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'অনেক ছেলে-মেয়েই বলতে পারবে না বাংলা সাল কত। ইংরেজি স্কুলে বাংলা পঞ্জিকা শেখানো হয় কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়। এভাবে ভুলতে ভুলতে আমরা অনেক দিক থেকে হারিয়ে যাব।' এই প্রসঙ্গে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো নিজেদের মৌলিক বর্ণমালা হারিয়ে রোমান লিপি ব্যবহার করছে, যা সংস্কৃতির জন্য একটি বড় দুর্লক্ষণ।
বাংলাদেশের অভিন্ন সংস্কৃতির ভিত্তি
রিজভী বলেন, 'দেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধর্মবিরোধী হিসেবে দেখার প্রবণতা ঠিক নয়। ইসলামী ঐতিহ্য ও লোকজ ধারা মিলেই এ অঞ্চলের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ইউসুফ-জুলেখা, লাইলি-মজনু, রামায়ণভিত্তিক কাহিনি, গম্ভীরা, কবিগান, জারি-সারি, যাত্রাপালা—সব মিলিয়ে এ দেশের অভিন্ন সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, আউল-বাউল সংস্কৃতির অংশ এবং উগ্রবাদী আক্রমণ এটিকে ধ্বংস করতে পারে, যা সংস্কৃতির মর্মমূলে আঘাত করবে।
সংস্কৃতি রক্ষায় করণীয়
বিএনপির এই সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, দেশের মূল সংস্কৃতির চর্চা ধরে রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে এটিকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হবে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, এতে যেন কোনো ধরনের অশ্লীলতা প্রবেশ না করে। তিনি বলেন, যাত্রাপালা, পালাগানসহ বিভিন্ন পরিবেশনশিল্প একসময় মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্বাধিকারের চেতনা এসব শিল্পমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
রুহুল কবির রিজভী শেষে বলেন, সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জাতির জন্য অত্যন্ত জরুরি, এবং এজন্য সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।



