ডেঙ্গু ও হামের দ্বৈত সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ ও জনসচেতনতার গুরুত্ব
ডেঙ্গু ও হামের দ্বৈত সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ

যাবতীয় রোগ-ব্যাধির প্রাদুর্ভাব কেবল সাধারণ মানুষের জীবনকেই বিপন্ন করে না, বরং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতাকেও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ঠিক তেমনই এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে দেশব্যাপী হামের প্রকোপ এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি, তার ওপর মস্ত বড় আপদ হিসাবে হাজির হয়েছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের সংক্রমণ।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

গতকাল ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী, এক দিনে ডেঙ্গুতে আরো এক জনের মৃত্যু এবং আক্রান্তের সংখ্যা তিন সহস্রাধিক ছাড়িয়েছে। চলতি বছর ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আসন্ন বর্ষাকালে এর প্রাদুর্ভাব আরো বাড়তে পারে। হামের মতো এই সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার ঘটলে তা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে হবে 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' স্বরূপ।

সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ

অবশ্য বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই এই দ্বিবিধ স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় নানামুখী ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের তৎপরতায় ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হওয়ার পূর্বেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি পরিদৃষ্ট হচ্ছে। ইতিমধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বিশেষ 'ডেঙ্গু কর্নার' চালু করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তা ছাড়া, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে একটি সুসজ্জিত ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনে জেলা পর্যায়েও এমন হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তাও অত্যন্ত সময়োপযোগী। চিকিৎসাসামগ্রী ও স্যালাইনের মজুত বৃদ্ধির পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের সাথে সমন্বয় করে মশার উৎসস্থল ধ্বংসের কাজও শুরু হয়েছে। একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ চালুর পরিকল্পনা তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আরো সহজ করবে বলে আশা করা যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি

উপরোক্ত উদ্যোগগুলো ইতিবাচক হলেও ডেঙ্গু রোগের ভয়াবহতা ও প্রকৃতি অনুধাবন করা আবশ্যক। এই ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার, যাতে প্রত্যেক নাগরিক তার বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেন। ডেঙ্গুর প্রজনন ক্ষেত্র যাতে গড়ে উঠতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা একান্ত প্রয়োজন।

আমরা জানি, ডেঙ্গু একটি তীব্র ভাইরাসজনিত জ্বর, যা মূলত 'এডিস এজিপ্টি' নামক স্ত্রী মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এই মশা সাধারণত স্বচ্ছ ও স্থির জলে ডিম পাড়ে। গৃহস্থালির ফুলের টব, ভাঙা প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা কিংবা পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির প্রধান ক্ষেত্র। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর তীব্র জ্বর, চোখের পিছনে ব্যথা, পেশি ও হাড়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা এবং শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করে।

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

অতএব, এই মরণব্যাধি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কেবল সরকারি উদ্যোগের উপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না; রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয় পক্ষকেই আরো কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন:

  • সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে কেবল লোকদেখানো ঔষধ ছিটানো বন্ধ করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে এবং নিয়মিত ড্রেন ও জলাশয় পরিষ্কার রাখতে হবে।
  • দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত কিট ও ফ্লুইড স্যালাইন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রোগীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটে আসতে না হয়।
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসার ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে হবে এবং গণমাধ্যমে সঠিক গাইডলাইন প্রচার করতে হবে।
  • নাগরিক সমাজকে অনুধাবন করতে হবে যে, নিজের ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই। প্রতি তিন দিনে এক বার বাসাবাড়ির কোথাও যেন জল জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • ঘুমানোর সময় আবশ্যিকভাবে মশারি ব্যবহার করা এবং শিশুদের ফুল হাতা পোশাক পরিধান করানো উচিত।
  • শরীরে জ্বরের লক্ষণ দেখামাত্রই বিলম্ব না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে।

সমন্বিত প্রচেষ্টায় সমাধান

মোটকথা, সরকারের সার্বিক প্রস্তুতি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জনগণের সচেতন প্রয়াস—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই কেবল হাম ও ডেঙ্গুর মতো যুগপৎ বিপর্যয় থেকে দেশের জনসাধারণকে রক্ষা করা সম্ভব।