রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঈদের আগের রাতে ছয় নবজাতকের মৃত্যু দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি করেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এক থেকে তিন দিন বয়সী ছয়টি শিশুর মৃত্যু কীভাবে হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
ঘটনার বিবরণ
হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ১১ জন মা ও ছয় নবজাতক ছিলেন। রাত ২টার দিকে কয়েকজন মা শিশুদের ঠান্ডা লাগছে জানিয়ে ওয়ার্ডের এসি বন্ধ করার অনুরোধ করেন। পরে দায়িত্বরত নার্সরা এসি বন্ধ করে দেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর আবার এসি চালু করা হয়। রাত ৪টার দিকে প্রথম একটি শিশু অস্বাভাবিকভাবে কান্না শুরু করলে তাকে এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকটি শিশুর মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়। ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ওয়ার্ডটির পরিবেশ ছিল ‘শ্বাসরুদ্ধকর’। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসি বন্ধ থাকলে সেখানে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান বলেন, এটি সাধারণ চিকিৎসাজনিত জটিলতা বলে মনে হচ্ছে না। তার ধারণা, ‘কোনো টেকনিক্যাল ফল্ট’ থেকে এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
তদন্ত ও নমুনা সংগ্রহ
ঘটনার পর এসি থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও ডিএমপির বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। ওয়ার্ডটি সিলগালা করা হয়েছে। ঘটনার তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে ৩ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে চিকিৎসা ব্যবস্থার ত্রুটি, অবকাঠামোগত সমস্যা, এসি বা ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা সব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
হাসপাতালের প্রতিক্রিয়া
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং তারা গভীরভাবে ব্যথিত। তিনি জানান, হাসপাতালও নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে এবং কোনো গাফিলতি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, একসঙ্গে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু আমাদের হাসপাতালের ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি।
স্বজনদের আহাজারি
হাসপাতালে নিহত শিশুদের পরিবারগুলোর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। স্বজনদের অভিযোগ, শিশুরা অসুস্থ হওয়ার পর যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কেউ কেউ এটিকে সরাসরি ‘অবহেলার ফল’ বলেও দাবি করছেন। মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা এক দাদি জানান, হঠাৎ করেই সব শিশু কান্না শুরু করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
অমীমাংসিত প্রশ্ন
যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি: এসি বন্ধ থাকায় কি অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল? কোনো গ্যাস লিক বা কারিগরি ত্রুটি ছিল কি? পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা কেন ছিল না? শিশুরা অসুস্থ হওয়ার পর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা যথেষ্ট ছিল কি? ময়নাতদন্ত ছাড়া প্রকৃত কারণ নির্ণয় সম্ভব হবে কি? তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। তবে ঘটনাটি দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও নবজাতক পরিচর্যা ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।



