মাজার জিয়ারতের ইসলামিক বিধান: কী করবেন, কী করবেন না
মাজার জিয়ারতের ইসলামিক বিধান ও নিয়ম

বর্তমান সময়ে মাজার বা কবর জিয়ারত একটি জনপ্রিয় ট্রেন্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের সমাধিতে ফুলের শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দেখা যায় নেতাকর্মীদের। কিন্তু এই জিয়ারত ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য? আজকের আলোচনায় আমরা মাজার জিয়ারত সম্পর্কে ইসলামের বিধান ও নিয়মাবলি নিয়ে বিস্তারিত জানবো।

মাজার জিয়ারত: ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামে মাজার বা কবর জিয়ারত করা মুস্তাহাব ও সুন্নাত হিসেবে বিবেচিত হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও মাগফিরাত কামনা করা। তবে কিছু কাজ ইসলামে নিষিদ্ধ, যেমন কবর পাকা করা, ওরস পালন করা, মাজারে সিজদা করা বা ওলী-আল্লাহর কাছে সরাসরি সাহায্য প্রার্থনা করা। এসব কাজ শিরক ও বিদয়াতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হয়।

হাদিসের আলোকে জিয়ারতের গুরুত্ব

হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে উল্লেখ আছে যে, নবীজি (সা.) একবার নিজের মায়ের কবরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কেঁদেছিলেন এবং আশেপাশের লোকদেরও কাঁদিয়েছিলেন। এরপর রাসুল (সা.) বললেন, তিনি তার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে আল্লাহর কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু তা দেওয়া হয়নি। পরে তিনি কবর জিয়ারতের অনুমতি চাইলে তা মঞ্জুর হয়। তিনি বললেন, "আপনারা কবর জিয়ারত করুন, কারণ কবর মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।" (সহিহ মুসলিম: ৯৭৬)।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জিয়ারতের সময় নিষিদ্ধ কাজ

কবর জিয়ারতের সময় শোক প্রকাশ করতে গিয়ে উচ্চৈস্বরে কান্নাকাটি করা, বুক বা গাল চাপড়ানো, জামার বুক ছিঁড়ে ফেলা ইসলামে নিষিদ্ধ। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, "যারা গাল চাপড়ায়, জামার বুক ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলি যুগের মতো চিৎকার করে, তারা আমাদের তরিকাভুক্ত নয়।" (সহিহ বুখারি: ১২৯৪)।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কবর জিয়ারতের সঠিক নিয়ম

কবর জিয়ারতের সময় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা উচিত। প্রথমে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মাইয়েতের চেহারার দিকে মুখ করে সালাম দিতে হবে। এরপর মৃতের সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরিফ বা বিভিন্ন দোয়া পড়া যেতে পারে। হাদিসে উল্লিখিত বিশেষ ফজিলতপূর্ণ সুরা যেমন সুরা ফাতেহা, আয়াতুল কুরসী, সুরা ইখলাস তিলাওয়াত করে মৃতের জন্য সওয়াব পাঠানো যায়।

মৃতের জন্য হাত তুলে দোয়া করতে চাইলে কবরের দিকে ফিরে নয়, বরং কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতে হবে। কবরের দিকে ফিরে হাত তুলে দোয়া করা উচিত নয়। তবে মনে মনে দোয়া করাও জায়েজ।

মা-বাবার কবর জিয়ারতের দোয়া

মা-বাবার কবর জিয়ারত করতে গেলে প্রথমে এই সালামটি পাঠ করা উত্তম: "আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবূরি ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম আনতুম সালাফুনা ওয়া নাহনু বিল আসারি।" অর্থ: হে কবরবাসী, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, তোমরা আমাদের আগে গেছ আর আমরাও তোমাদের অনুসরণ করবো। (সুনানে তিরমিজি: ৫৯৬)।

এরপর বাবা-মায়ের জন্য আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করে এই দোয়া পড়া যেতে পারে: "রাব্বির-হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।" অর্থ: হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালনপালন করেছেন। (সুরা বনি ইসরাইল: ২৪)।

মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এই দোয়াটিও পড়া যায়: "রাব্বানাগ ফিরলি ওয়া লিওয়ালিদাইয়া ওয়া লিলমুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।" অর্থ: হে আমাদের রব! হিসাব গ্রহণের দিন আমাকে, আমার মা-বাবাকে আর মুমিনদের ক্ষমা করুন। (সুরা ইবরাহিম: ৪১)।

সতর্কতা ও উপসংহার

মাজার জিয়ারত ইসলামিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, তবে এতে অতিরঞ্জন বা বিদয়াতি কাজ এড়িয়ে চলা জরুরি। কবরবাসীর মাগফিরাত কামনা ও মৃত্যুর স্মরণই হওয়া উচিত এর মূল লক্ষ্য। হাদিস ও কোরআনের নির্দেশনা মেনে সঠিক নিয়মে জিয়ারত করলে এটি সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য হবে।