প্রযুক্তির অতি ব্যবহারে নামাজে মনোযোগ কমছে: শায়খ আহমাদুল্লাহ
প্রযুক্তির অতি ব্যবহারে নামাজে মনোযোগ কমছে: শায়খ আহমাদুল্লাহ

জনপ্রিয় আলেম ও আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল ২০২৬) তার ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলে ‘প্রযুক্তির কাছে যেন হেরে না যায় আমাদের নামাজ!’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মানুষের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে নামাজে মাত্র পাঁচ মিনিট মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বৈশ্বিক সংকটে মনোযোগহীনতা

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘মনে না থাকার সমস্যা বা মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার বিষয়টা এখন একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু আপনার বা আমার সমস্যা নয়, সারা পৃথিবীর মানুষের সমস্যা। আজকাল প্রায় প্রত্যেক মানুষকে দেখা যায় যে কিছু মনে থাকে না, মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।’

নামাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন

তিনি আরও বলেন, ‘আমি লক্ষ্য করেছি, মাত্র দুই রাকাত নামাজ, যা তিন-চার মিনিটে পড়া সম্ভব, এমনকি দুই মিনিটেও পড়া যায়, এই দুই রাকাত নামাজে মনোযোগ শুধু আল্লাহর দিকে থাকে—এমন মানুষ হাজার হাজার মুসল্লির মধ্যে একজনও পাওয়া যায় না। আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন, নফল নামাজ দুই রাকাত করে পড়ুন, দেখুন একবারও মন অন্যদিকে যায় কি না। খুব কঠিন হয়ে গেছে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণার তথ্য

গবেষকরা বলছেন, মানুষের ফোকাস ধরে রাখার ক্ষমতা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। আগে মানুষ ৩০-৪০ সেকেন্ড বা এক মিনিট ফোকাস রাখতে পারত, এখন তার অর্ধেকও নেই। প্রশ্ন হলো, ১৫-২০ বছর আগেও তো এই সংকট এত প্রকট ছিল না, এখন কেন এমন হচ্ছে? চিন্তা করলে দেখা যায়, এর মূল কারণ আমাদের স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার। এগুলো আমাদের ফোকাস, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দিচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

শায়খ আহমাদুল্লাহ তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি নিজে এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। আমার একজন প্রোডাক্টিভিটি কোচ আমাকে প্রতিদিন শারীরিক ব্যায়াম করান, আরেকজন সপ্তাহে একদিন আমার কাজগুলো আরও প্রোডাক্টিভ করার জন্য গাইড করেন। আমি তাকে বললাম, আগে ২০০ পৃষ্ঠার বই পড়লে মুখস্থ হয়ে যেত, এখন একটি লাইনও মুখস্থ রাখতে পারি না। ডাক্তার দেখিয়েছি, কোনো সমস্যা ধরা পড়ে না। তখন তিনি আমাকে বললেন, সকাল থেকে আপনি কতটি ফেসবুক পোস্ট দেখেছেন? আমি বললাম, অগণিত। তিনি বললেন, এটাই সমস্যা। আপনি ব্রেনকে ট্রেইন করছেন মুখস্থ না রাখতে, শুধু সাময়িক আনন্দ বা দুঃখ পেতে।’

ফেসবুক-ইউটিউবের প্রভাব

তিনি আরও বলেন, ‘ফেসবুক বা ইউটিউব স্ক্রল করতে করতে আমরা আসলে কিছুই মনে রাখি না। একটি পোস্ট বা কমেন্ট আগাগোড়া মনে করতে পারি না। এর মানে হলো আমাদের ব্রেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে মনোযোগ না রেখে অসংখ্য জিনিস পড়তে। ফলে কিছুই মনে থাকে না। আমি কয়েক মাস হলো মোবাইল থেকে ফেসবুক, ইউটিউব সব অ্যাপ মুছে ফেলেছি। অফিসে বা বাসায় কোনো পিসিতে নিউজফিডে ঢোকার সুযোগ নেই। আলহামদুলিল্লাহ, আমি এখন অনেক ভালো আছি। নামাজে মনোযোগ বাড়ছে, ফোকাস ফিরছে।’

সন্তানের কাছে স্মার্টফোন নেই

শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, তার ১৭-১৮ বছরের ছেলের কাছে এখনো কোনো স্মার্টফোন নেই, এবং তার কোনো আগ্রহও নেই। বাইরে গেলে যোগাযোগের জন্য শুধু একটি ছোট বাটন ফোন দেওয়া হয়েছে। আগে মানুষ ফোন ছাড়া বেঁচে ছিল, বিপদে পড়লে সমাধানও করত। আজ আমরা শয়তানের প্ররোচনায় মনে করি ফোন ছাড়া জীবন অসম্ভব।

প্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের আহ্বান

মনোযোগ বাড়ানোর জন্য আমাদের অবশ্যই সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করুন, সোশ্যাল মিডিয়াকে আপনাকে ব্যবহার করার সুযোগ দেবেন না। অনেক সময় আমরা দাওয়াতের কাজের নাম দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রল করি। এটি কখনও একজন মুসলমানের লাইফস্টাইল হতে পারে না।’

শায়খ আহমাদুল্লাহ শেষে বলেন, ‘আমি জানি এই স্রোতের বিপরীতে আমার কথাগুলো খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না, কিন্তু আমি আমার দায়িত্ব পালন করলাম। আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেবেন, তিনি হয়তো সিদ্ধান্ত নেবেন, তার জীবনকে আরও প্রোডাক্টিভ করবেন, বরকত দিয়ে পরিপূর্ণ করবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন।’