অধিকাংশ মানেই সঠিক-বেঠিকের মানদণ্ড নয়; বরং অল্পসংখ্যক বান্দাই কৃতজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনুল কারিমের একাধিক বর্ণনা থেকে তা প্রমাণিত হয়। বিষয়টি ফুটে উঠেছে এক ব্যক্তির দোয়া ও হজরত ওমর (রা.)-এর জিজ্ঞাসাবাদ থেকে। কী সেই ঘটনা?
ঘটনার বিবরণ
এক ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিলেন: 'ইয়া আল্লাহ! আমাকে আপনার অল্পসংখ্যক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন, হে আল্লাহ! আমাকে আপনার অল্পসংখ্যক লোকের মাঝে শামিল করে নিন।' হজরত ওমর (রা.) সেই দোয়া শুনে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: 'তুমি এই দোয়া কোথা থেকে শিখেছ?' উত্তরে সেই ব্যক্তি বলল: 'আল্লাহর কুরআন থেকে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন: وَ قَلِیۡلٌ مِّنۡ عِبَادِیَ الشَّكُوۡرُ (আর আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ) (সুরা সাবা: আয়াত ১৩)।' হজরত ওমর (রা.) উত্তর শুনে নিজেকে উপদেশ দিতে লাগলেন: 'হে ওমর! মানুষ তোমার থেকে অধিক জ্ঞানী।' সাথে তিনিও দোয়া করতে লাগলেন: 'হে আল্লাহ! আমাকেও আপনার অল্পসংখ্যক লোকের মধ্যে গণ্য করে নিন।'
ভাবনা ও শিক্ষা
আমরা দেখেছি, যখন আমরা কোনো ব্যক্তিকে কোনো পাপকাজ বা আল্লাহর অবাধ্যতা ছেড়ে দিতে বলি, বা কোনো বিশুদ্ধ সুন্নাহ প্র্যাকটিস করতে বা মেনে চলতে বলি, তখন সেই ব্যক্তি যুক্তি দেখায়: 'এই কাজ তো অধিকাংশ ব্যক্তিই করে, আমি করলে কি সমস্যা?' অধিকাংশ লোক কি বুঝে না? সবাই ভুল, শুধু তুমিই ঠিক?
এখন যদি আমরা কুরআনে ব্যবহৃত 'অধিকাংশ ব্যক্তি' বা 'অধিকাংশ' লিখে অনুসন্ধান করি, তাহলে পাবো:
- وَ لٰكِنَّ اَكۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ (অধিকাংশ ব্যক্তিই তা জানে না) (সুরা আরাফ: আয়াত ১৮৭)
- وَ لٰكِنَّ اَكۡثَرَ النَّاسِ لَا یَشۡكُرُوۡنَ (অধিকাংশ ব্যক্তিই কৃতজ্ঞতা আদায় করে না) (সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৩)
- وَ لٰكِنَّ اَكۡثَرَ النَّاسِ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ (অধিকাংশ ব্যক্তিই বিশ্বাস করে না) (সুরা হুদ: আয়াত ১৭)
- وَ اَنَّ اَكۡثَرَكُمۡ فٰسِقُوۡنَ (তোমাদের অধিকাংশই অবাধ্য) (সুরা মায়েদা: আয়াত ৫৯)
- وَ لٰكِنَّ اَكۡثَرَهُمۡ یَجۡهَلُوۡنَ (তাদের অধিকাংশই মূর্খ) (সুরা আনআম: আয়াত ১১১)
- بَلۡ اَكۡثَرُهُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ۙ الۡحَقَّ فَهُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ (কিন্তু তাদের বেশিরভাগই প্রকৃত সত্যকে জানে না; তাই তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়) (সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ২৪)
- اَكۡثَرُهُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ (তাদের অধিকাংশই বুঝে না) (সুরা আল হুজরাত: আয়াত ৪)
- فَاَعۡرَضَ اَكۡثَرُهُمۡ فَهُمۡ لَا یَسۡمَعُوۡنَ (অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারা শোনে না) (সুরা হা-মীম আস-সাজদা (ফুসসিলাত): আয়াত ৪)
অল্পসংখ্যকের মর্যাদা
তারপর আমরা যদি কুরআনে 'অল্পসংখ্যক' লিখে অনুসন্ধান করি, তাহলে পাবো আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
- وَ قَلِیۡلٌ مِّنۡ عِبَادِیَ الشَّكُوۡرُ (আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ) (সুরা সাবা: আয়াত ১৩)
- وَ مَاۤ اٰمَنَ مَعَهٗۤ اِلَّا قَلِیۡلٌ (আর অল্পসংখ্যকই তার সাথে ঈমান এনেছিলো) (সুরা হুদ: আয়াত ৪০)
- ثُلَّۃٌ مِّنَ الۡاَوَّلِیۡنَ وَ قَلِیۡلٌ مِّنَ الۡاٰخِرِیۡنَ (একদল পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে এবং অল্পসংখ্যক পরবর্তীদের মধ্য থেকে) (সুরা ওয়াকিয়া: আয়াত ১৩-১৪)
সুতরাং বেশি সংখ্যক হলেই যে সঠিক হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং আল্লাহ তাআলা বেশি সংখ্যকের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছেন। পক্ষান্তরে অল্প সংখ্যকের মধ্যেই রহমত ও বরকত নিহিত। আল্লাহর ঘোষণাও সেরকমই। তাই আসুন আমরা এই অল্পসংখ্যক ব্যক্তিদের দলে শামিল হই। মনে রাখবেন: অধিকাংশ মানেই সঠিক-বেঠিকের মানদণ্ড নয়।



