কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের এক মহিমান্বিত ইবাদত। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অনন্য ত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহপ্রেমের স্মৃতিবাহী এই ইবাদত একজন মুমিনকে আত্মত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়।
জিলহজ মাসের গুরুত্ব
জিলহজ মাসের আগমন মানেই মুমিনের হৃদয়ে ইবাদতের এক বিশেষ আবহ তৈরি হওয়া। এই মাসের প্রথম দশ দিন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। আর এ সময় যারা কুরবানি করার নিয়ত করেন, তাদের জন্য রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় ও বর্জনীয় আমল; যা অনেকেই অবহেলা করেন কিংবা জানেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন—لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা আল-হাজ্জ: আয়াত ৩৭) কুরবানি মূলত তাকওয়া, আন্তরিকতা ও আল্লাহর নির্দেশ পালনের নাম। তাই কুরবানির প্রস্তুতিও হওয়া উচিত সুন্নাহ অনুযায়ী।
জিলহজ শুরু হলে কুরবানিদাতার করণীয়
যে ব্যক্তি কুরবানি করার ইচ্ছা পোষণ করে, তার জন্য জিলহজ মাস শুরু হওয়ার পর থেকে কুরবানির পশু জবাই করা পর্যন্ত নিজের চুল, নখ ও শরীরের চামড়ার অংশ না কাটাই সুন্নাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعْرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا ‘যখন জিলহজের প্রথম দশ দিন শুরু হবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছা করবে, তখন সে যেন তার চুল ও শরীরের কোনো অংশ স্পর্শ না করে (অর্থাৎ না কাটে)।’ (মুসলিম ১৯৭৭) অন্য বর্ণনায় এসেছে—فَلَا يَأْخُذَنَّ شَعْرًا وَلَا يَقْلِمَنَّ ظُفُرًا ‘সে যেন কোনো চুল না কাটে এবং নখও না কাটে।’ (মুসলিম ১৯৭৭) অনেক ইসলামি স্কলার এ আমলকে ওয়াজিব বলেছেন এবং তা অমান্য করাকে গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আবার কেউ কেউ এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ বলেছেন। তাই একজন মুমিনের উচিত— এ আমলের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।
জিলকদের শেষ সপ্তাহ থেকেই প্রস্তুতি
আরবি মাস কখনো ২৯ দিনে, আবার কখনো ৩০ দিনে সম্পন্ন হয়। তাই জিলহজ মাস কখন শুরু হবে, তা আগে থেকেই খেয়াল রাখা জরুরি। যাদের নখ কাটা, চুল কাটা, গোঁফ বা অন্যান্য ক্ষুরকর্ম প্রয়োজন রয়েছে, তারা জিলকদ মাসের শেষ সপ্তাহেই তা সম্পন্ন করে নেওয়া উত্তম। এতে জিলহজ শুরু হওয়ার পর সুন্নাহ অনুযায়ী চুল-নখ না কাটার আমল সহজ হবে।
ভুলে বা জেনে নখ-চুল কেটে ফেললে কী হবে?
কুরবানি করার নিয়ত থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি ভুলবশত কিংবা জেনে-শুনে চুল বা নখ কেটে ফেলে, তাহলে তার কুরবানি সহিহ হবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে করলে আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করা উচিত। কারণ এ আমল সুন্নাহর খেলাফ। তবে এর জন্য কোনো কাফফারা নেই।
একান্ত প্রয়োজনে কাটলে গুনাহ নেই
কখনো নখ ভেঙে গেলে, চামড়া উঠে গেলে কিংবা কোনো কারণে ক্ষতি হলে তা কেটে ফেলা জায়েজ রয়েছে। ইসলাম মানুষের কষ্ট চায় না; বরং সহজতা ও ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৫)
আগে নিয়ত ছিল না, পরে কুরবানির ইচ্ছা হলে
কেউ যদি জিলহজের চাঁদ ওঠার সময় কুরবানি করার নিয়ত না রাখে কিংবা সামর্থ্য না থাকে, তখন সে স্বাভাবিকভাবে চুল-নখ কাটতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে যদি কুরবানি করার সামর্থ্য বা ইচ্ছা তৈরি হয়, তাহলে সেই সময় থেকে কুরবানি করা পর্যন্ত আর চুল-নখ কাটবে না।
অসিয়তকারী বা দায়িত্ব প্রদানকারী ব্যক্তির বিধান
কেউ যদি অন্য কাউকে কুরবানি করার দায়িত্ব দেয় কিংবা মৃত্যুর আগে কুরবানির অসিয়ত করে যায়, তাহলে অসিয়তকারী বা দায়িত্ব প্রদানকারী ব্যক্তির জন্যও এ সুন্নাহ প্রযোজ্য হবে। তবে যার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার জন্য চুল-নখ না কাটার বিধান প্রযোজ্য নয়— যদি সে নিজে কুরবানি করার নিয়ত না রাখে।
পরিবারের অন্য সদস্যদের বিধান
পরিবারে একজন কুরবানি করলেও, যারা কুরবানি করবে না, যেমন— স্ত্রী, সন্তান বা অন্য আত্মীয়স্বজন— তারা এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে না। তারা স্বাভাবিকভাবে চুল-নখ কাটতে পারবে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করতেন; কিন্তু পরিবারের সদস্যদের চুল-নখ কাটতে নিষেধ করেছেন— এমন কোনো সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না।
কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা
কুরবানি শুধু পশু জবাই নয়; বরং এটি নিজের নফস, অহংকার ও দুনিয়ামুখী ভালোবাসাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করার শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—مَا عَمِلَ ابْنُ آدَمَ يَوْمَ النَّحْرِ عَمَلًا أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ ‘কুরবানির দিনে আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো আমল আদম সন্তানের নেই।’ (তিরমিজি ১৪৯৩, ইবনে মাজাহ ৩১২৬) জিলহজ মাস মুমিনের জীবনে রহমত, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক মহামূল্যবান সময়। এই মাসের প্রতিটি দিন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তাই কুরবানির মতো মহান ইবাদতের প্রস্তুতিও হওয়া উচিত সুন্নাহ ও তাকওয়ার আলোকে। চুল-নখ না কাটা হয়তো ছোট একটি আমল মনে হতে পারে; কিন্তু একজন মুমিনের জন্য প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতিটি সুন্নাহই মূল্যবান। কারণ ভালোবাসার প্রকৃত পরিচয় হলো— প্রিয়জনের আদর্শ অনুসরণ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করার তৌফিক দিন, সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দিন এবং আমাদের কুরবানি কবুল করুন। আমিন।



