‘১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রাচীন ম্যাগনেট পিলার’ পাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিয়েছে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও কোটি টাকার জমি। প্রায় দেড় বছর ধরে ‘জ্বিনের বাদশা’, ‘জ্বিনের মা’ ও ‘জ্বিনের রাণি’ পরিচয়ে সম্মোহন, ভয়ভীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে সর্বস্ব লুটে নেওয়া হয়েছে। হংকং প্রবাসী ব্যবসায়ী আজিজুল আলম এমন অভিযোগ করেন।
মামলা ও নতুন চাঞ্চল্য
এই ঘটনায় রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানায় ২৪ জনকে আসামি করে গত ১৪ এপ্রিল মামলা দায়ের করা হয়। এবার নতুন চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে ওই মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করা এক নারী আসামির পরিচয় নিয়ে। বাদীপক্ষের দাবি, প্রধান আসামির স্ত্রী পরিচয়ে যে কারাগারে আছে সে প্রকৃত শারমিন আক্তার একা নয়, বরং তার বোন।
প্রতারণার কৌশল
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ৫৫ বছর বয়সী আজিজুল আলম দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় হংকংয়ে বসবাস করেছেন। সেখানে তার একাধিক ব্যবসা ছিল। কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে উত্তরায় বসবাস শুরু করেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মিজান নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে তার পরিচয় হয় কথিত ফকির মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকিরের সঙ্গে।
প্রথমে সোহেল ফকির ও তার সহযোগীরা দাবি করেন, তাদের কাছে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ‘প্রাচীন ম্যাগনেট পিলার’ রয়েছে, যা বিদেশে ১০০ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করা সম্ভব। বিদেশে আজিজুল আলমের ব্যাংক হিসাব থাকায় তাকে এই ব্যবসার অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, সুন্নতি লেবাস, আধ্যাত্মিকতার অভিনয় এবং চটকদার কথাবার্তার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীর বিশ্বাস অর্জন করে সোহেল ফকির। এরপর শুরু হয় সম্মোহন ও প্রতারণার খেলা। ভুক্তভোগীর দাবি, তাকে বিভিন্ন সময় মিষ্টি, পানীয় ও খাবারের সঙ্গে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাওয়ানো হতো। একইসঙ্গে ‘কুফরি কালাম’, ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ও কালো জাদুর মাধ্যমে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
একপর্যায়ে ‘হযরত তৈয়ব আহম্মেদ চিশতী’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন করে নিজেকে ‘জ্বিনের বাদশা’ বলে পরিচয় দেয়। ফোনে বলা হতো, ‘বাবা তুই দুনিয়ার বাদশা, আখিরাতেরও বাদশা হয়ে গেছিস। তুই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মালিক হবি।’ কখনও দামী গাড়ি, বাড়ি ও আমেরিকা নেওয়ার প্রলোভন, আবার কখনও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে প্রভাবিত করা হতো।
চক্রের সদস্যদের ভূমিকা
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতো। কেউ ‘জ্বিনের বাদশা’, কেউ ‘জ্বিনের মা’, কেউ ‘জ্বিনের রাণি’, কেউ ‘ফকির’, আবার কেউ বিদেশি বায়ার পরিচয়ে প্রতারণা চালাতো। মোবাইল ফোনে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। মামলার অন্যতম আসামি শারমিন আক্তার একা ‘জ্বিনের রাণি’ এবং তার মা লাইলী শাহনাজ খুশি ওরফে মুন্নি ‘জ্বিনের মা’ সেজে ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের আবেদনে বলা হয়, ভুক্তভোগীকে বলা হয়েছিল, তার আশা পূরণ করতে হলে বিভিন্ন মাজারে সিন্নি দিতে হবে, যেখানে জ্বিনেরা এসে খাবার গ্রহণ করবে। এই সিন্নির জন্য গরু, মহিষ ও ছাগল কেনার কথা বলে কয়েক কোটি টাকা নেওয়া হয়।
আর্থিক ক্ষতি ও জমি হস্তান্তর
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নগদ ও ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে মোট ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এক পর্যায়ে আরও টাকা দাবি করলে আসামিরা তাকে ভয় দেখিয়ে বলে, টাকা না থাকলে ঘরের স্বর্ণালংকার দিতে হবে। পরে তার মা ও স্ত্রীর ব্যবহৃত প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণালংকার; যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা, আসামিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, উত্তরখান এলাকায় আজিজুল আলমের মালিকানাধীন ২৭ দশমিক ১৫ কাঠা জমির দলিলেও জোরপূর্বক সই নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৪ থেকে ১৬ কোটি টাকা।
ভুক্তভোগীর অবস্থা ও মামলা
ভুক্তভোগীর ভাষ্য, দীর্ঘদিন তাকে এক ধরনের ঘোরের মধ্যে রাখা হয়। সোহেল ফকিরের অফিসে ডেকে নিয়ে নেশাজাতীয় মিষ্টি খাওয়ানো হতো। পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে তিনি বুঝতে পারেন, পরিকল্পিত প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এরপর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় মামলা করেন।
আদালতে আত্মসমর্পণ ও পরিচয় জটিলতা
এদিকে গত ১২ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রধান সোহেল ফকিরের স্ত্রী পরিচয়ে শারমিন আক্তার একা এবং তার মা লাইলী শাহনাজ খুশি আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করে। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠান।
পরে ১৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার উপ-পরিদর্শক মাহবুবুল আলম দুই আসামির ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রিমান্ড শুনানির সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম শান্ত আদালতকে জানান, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারী প্রকৃত শারমিন আক্তার একা নয়।
তৌহিদুল ইসলাম শান্ত বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি, প্রধান আসামির স্ত্রীর জায়গায় তার শ্যালিকা আদালতে হাজির হয়েছে। তাই প্রকৃত আসামি শনাক্তের আবেদন করা হয় এবং আদালত সেটি মঞ্জুর করেন।’
এরপর আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে তিন দিনের মধ্যে প্রকৃত আসামি শনাক্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
তদন্তের অগ্রগতি
তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আসামির প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে এনআইডি, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদ এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাই করা প্রয়োজন। এ কারণে আদালতের কাছে অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, ১০-১২ বছর আগেও সোহেল ফকির ও তার পরিবার নিম্নমানের জীবনযাপন করতো। কিন্তু বর্তমানে তারা মিরপুর ডিওএইচএস, বসুন্ধরা, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির মতো এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, অফিস ও দামি গাড়ির মালিক হয়েছে। নিজ গ্রামেও বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। অথচ দৃশ্যমান কোনও বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি।’
আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া
এদিকে আসামিপক্ষের এক আইনজীবী আদালতে লিখিত আবেদন দিয়ে জানান, সরল বিশ্বাসে তিনি আসামিদের পক্ষে ওকালতনামা দাখিল করেছিলেন। কিন্তু পরে বাদীপক্ষের দেখানো অডিও-ভিডিও ও অন্যান্য তথ্য দেখে বুঝতে পারেন, তাকে প্রতারণার মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ওকালতনামা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন।
আসামিদের তালিকা
মামলার আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির (৩৮), তার স্ত্রী শারমিন আক্তার একা (৩৫), দুই ভাই মো. সবুজ ও রুবেল, শাশুড়ি লাইলী শাহনাজ খুশি ওরফে মুন্নি, নাজমুল হাসান ও এ আর রাসেল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এটি একটি সুসংগঠিত প্রতারক চক্র। তারা দীর্ঘদিন ধরে জ্বিন, অলৌকিক সম্পদ ও আধ্যাত্মিক শক্তির গল্প শুনিয়ে সহজ-সরল ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের টার্গেট করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আসছিল। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।



