আয়কর ও জমির খাজনা দিলে জাকাত মাফ হয় কি?
বর্তমান সময়ে অনেক মুসলমানের মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জাগে—আমি তো সরকারকে আয়কর দিচ্ছি, জমির খাজনা দিচ্ছি, তাহলে কি আবার আলাদা করে জাকাত দিতে হবে? কেউ কেউ মনে করেন, রাষ্ট্রকে দেওয়া এই আর্থিক দায়গুলোই হয়তো জাকাতের বিকল্প। আবার অনেকে জানতে চান, আয়কর বা খাজনার অর্থ কি জাকাতের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে?
জাকাত কী এবং কেন ফরজ?
জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। এটি আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত একটি ইবাদত, যা নির্দিষ্ট সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট হারে আদায় করতে হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ‘তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা কর এবং জাকাত আদায় কর।’ (সুরা আল-বাকারাহ: আয়াত ৪৩) আরও ইরশাদ হয়েছে—خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা (জাকাত) গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ১০৩) এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, জাকাত কেবল অর্থ আদান-প্রদান নয়; এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করারও একটি মাধ্যম।
আয়কর ও জাকাত কি একই বিষয়?
না। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে আয়কর (Tax) এবং জাকাত সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আয়কর হলো রাষ্ট্র পরিচালনা, অবকাঠামো, প্রশাসন, নিরাপত্তা ও জনকল্যাণের জন্য সরকার কর্তৃক আরোপিত আর্থিক দায়। অন্যদিকে জাকাত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ইবাদত, যা নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করতে হয় এবং এর নির্দিষ্ট হকদার রয়েছে। আল্লাহ তাআলা জাকাতের খাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন—اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَ الۡمَسٰكِیۡنِ وَ الۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡهَا وَ الۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُهُمۡ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الۡغٰرِمِیۡنَ وَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیۡمٌ حَكِیۡمٌ ‘নিশ্চয়ই সদকাসমূহ (জাকাত) হলো ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, তাদের জন্য; (তা বণ্টন করা যায়) দাস আজাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ৬০) অর্থাৎ জাকাতের খাত আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন; মানুষ বা রাষ্ট্র ইচ্ছামতো তা পরিবর্তন করতে পারে না।
জমির খাজনা দিলে কি জাকাত মাফ হবে?
জমির খাজনা বা সরকারি ভূমি কর দেওয়া একটি নাগরিক দায়িত্ব। এটি জাকাতের বিকল্প নয়। কারণ—খাজনা রাষ্ট্রীয় আইনভিত্তিক দায়, জাকাত শরিয়ত নির্ধারিত ফরজ ইবাদত, এবং উভয়ের নিয়ত, উদ্দেশ্য ও খাত ভিন্ন। তাই জমির খাজনা আদায় করলেও যদি কারও ওপর জাকাত ফরজ হয়, তবে তাকে জাকাতও আদায় করতে হবে।
হাদিসের আলোকে জাকাতের স্বতন্ত্র গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ ‘ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি— ১. আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। ২. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। ৩. জাকাত আদায় করা। ৪. হজ সম্পাদন করা এবং ৫. রমাজানের রোজা পালন করা।’ (বুখারি ৮, মুসলিম ১৬) আরেক হাদিসে এসেছে—مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ ‘সদকা (জাকাত) সম্পদ কমায় না।’ (মুসলিম ২৫৮৮) এ থেকে বোঝা যায়, জাকাত একটি আলাদা ইবাদত; এটি অন্য কোনো আর্থিক দায় দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না।
ইসলামিক স্কলারদের মতামত
ইমাম কাসানি (রহ.) বলেন— ‘জাকাত আল্লাহর নির্ধারিত ইবাদত। তাই অন্য কোনো আর্থিক ব্যয় দ্বারা এর দায়িত্ব আদায় হবে না।’ (বদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২) ইমাম নববি (রহ.) বলেন— ‘জাকাতের নিয়ত ছাড়া অন্য কোনো খাতে অর্থ ব্যয় করলে তা জাকাত হিসেবে গণ্য হবে না।’ (আল-মাজমু, খণ্ড ৬) মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন— ‘সরকারি ট্যাক্স, ইনকাম ট্যাক্স বা অন্যান্য নাগরিক কর জাকাতের বিকল্প নয়। কারণ জাকাত একটি ইবাদত, যা নির্দিষ্ট খাতে এবং নির্দিষ্ট নিয়তে আদায় করতে হয়।’ (ফিকহি প্রবন্ধ ও সমকালীন মাসাইল) দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়ায় বলা হয়েছে— ‘আয়কর প্রদান করলে জাকাত আদায়ের দায়িত্ব রহিত হবে না। কারণ আয়কর রাষ্ট্রের হক আর জাকাত আল্লাহর হক।’
আয়কর কি জাকাতের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে?
সাধারণভাবে না। কারণ—জাকাতের জন্য নিয়ত জরুরি, জাকাত নির্দিষ্ট হকদারদের দিতে হয়, আয়কর সরকার নির্ধারিত খাতে ব্যয় হয়, এবং জাকাত ইবাদত, ট্যাক্স নাগরিক দায়িত্ব। তবে যদি কোনো ইসলামি রাষ্ট্র শরিয়তসম্মতভাবে জাকাত আদায় করে এবং তা যথাযথ খাতে বণ্টন করে, তখন আলাদা বিষয় হতে পারে। কিন্তু সাধারণ সরকারি আয়কর জাকাত হিসেবে গণ্য হবে না।
ইসলামে জাকাত কেবল অর্থনৈতিক বিধান নয়; এটি ঈমান ও ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আয়কর, ভ্যাট, খাজনা বা অন্যান্য সরকারি কর দেওয়া নাগরিক দায়িত্ব হতে পারে, কিন্তু তা কখনো জাকাতের বিকল্প নয়। তাই কোনো মুসলমান যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে সরকারি কর দেওয়ার পরও তাকে শরিয়ত অনুযায়ী জাকাত আদায় করতে হবে। কারণ জাকাত আল্লাহর হক, আর এই হক যথাযথভাবে আদায় করলেই সম্পদে বরকত ও আত্মার পবিত্রতা আসে।



