প্রতিবন্ধী শহরত আলী নিখোঁজ: মায়ের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ
‘আমি ব্যাটাক লিইয়্যা ঈদ করবের চাই, তুমরা পেপারেত লিকে আইনা দেও।’ এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার রামগুইয়া গ্রামের বাসিন্দা আলেয়া বেওয়া (৫৪)। তাঁর একমাত্র ছেলে শহরত আলী (৩২), যিনি মানসিক প্রতিবন্ধী, গত ১২ মার্চ বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। ছেলেকে হারিয়ে আলেয়া এখন পাগলপ্রায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
নিখোঁজের বিস্তারিত ঘটনা
আলেয়া বেওয়া জানান, শহরত আলী প্রতিদিন সকালে খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করেন এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসেন। মাঝেমধ্যে এলাকার বাইরে গেলে এক দিন পরই ফিরে আসতেন। কিন্তু এবার উল্টো ঘটনা ঘটেছে। ১২ মার্চ সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে তিনি আর ফেরেননি। ছেলের অপেক্ষায় কয়েক দিন কাটানোর পর আলেয়া বুঝতে পারেন, এবার ছেলে হারিয়ে গেছেন।
নিখোঁজ হওয়ার সময় শহরত আলীর পরনে ছিল শুধু ট্রাউজার, মুখে হালকা দাড়ি, শরীরে অন্য কোনো কাপড় ছিল না। এলাকায় মাইকিং করা ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করা হয়েছে। এলাকার এক ট্রাকচালক নাটোরের বরাইগ্রামে তাঁকে দেখেছেন বলে জানালে, পরের দিন সেখানে গিয়ে খোঁজ করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। এক দিন ধরে ওই এলাকায় খোঁজাখুঁজি চালানো হয়, কিন্তু কোনো সন্ধান মেলেনি।
পরিবারের বেদনাদায়ক ইতিহাস
শহরত আলীর একমাত্র বোন লাকী খাতুন (২৬) বলেন, ‘আমার ভাই আগে ভালো ছিল। মানুষের কাজকর্ম করে সংসার চালাত। টাকা জমিয়ে একটা মোবাইল ফোন কিনেছিল। ওই মোবাইল চুরি যাওয়ার পর পাগল হয়ে গেছে। পাগল হয়ে ১৩ বছর ধরে বাড়িতে ছিল। একদিন হারিয়ে গেল।’
প্রতিবেশী শামসুল আলম জানান, শহরত আলীর একসময় ঘরসংসার ছিল। সড়কের পাশে কুঁড়েঘরে বসবাস করতেন। বাবা হারানো শহরত মায়ের কাছেই বেড়ে উঠেছেন। মোবাইল হারানোর ঘটনাটি তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
মায়ের করুন আবেদন
আজ শুক্রবার দুপুরে বাগমারা প্রেসক্লাবে এসে ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নাকাটি করেন আলেয়া বেওয়া। নিখোঁজের বর্ণনা দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে তিনি কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আমার ব্যাটা কারোর সাথে কথা বলে না, কিছু চুরিও করে না। কেউ কিছু না দিলে চাইবেও না, সেই ছাওয়াল এখন না খেয়ে মরছে।’
আলেয়া আরও বলেন, ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনি ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে পারছেন না। ঈদের কোনো বাজারও করতে পারেননি। তাঁর মতে, ছেলেকে ফিরে পেলেই সেটা ঈদের চেয়ে বড় আনন্দ হবে।
পুলিশের প্রতিক্রিয়া
বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইদুল আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। কেউ এ বিষয়ে থানায় কিছু জানাননি। আপনার মাধ্যমে প্রথম জানলাম। এখন একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখি।’ পুলিশ এখন ঘটনাটি তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনা সমাজে মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরছে। আলেয়া বেওয়ার মতো অসহায় মায়ের আর্তনাদ সকলের সহানুভূতি ও দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে।



