২০২৬ সালের স্বাস্থ্যসুরক্ষা লক্ষ্য: গবেষণা ও ঝুঁকি মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোস্তফা আজিজ। তিনি গবেষণার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, খাদ্যে ভেজাল ও ক্যানসার ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও পদোন্নতির প্রভাব
মোস্তফা আজিজ উল্লেখ করেন, ২০২৬ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্য অর্জনে গবেষণার ভূমিকা অপরিহার্য। তবে বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। তিনি বলেন, "লজিস্টিক সাপোর্ট বা অবকাঠামো একদম নেই, তা নয়; কিন্তু চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা অনেক কম।" বড় সমস্যা হিসেবে তিনি একাডেমিক কারিকুলাম ও চিকিৎসকদের পদোন্নতিতে গবেষণাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি পরামর্শ দেন, "যদি ইনডেক্সড জার্নালে গবেষণা প্রকাশ ছাড়া পদোন্নতি না হতো, তবে চিকিৎসকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গবেষণায় যোগ দিতেন।" গবেষণামুখী না হলে বিজ্ঞানের সুফল পাওয়া কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংক্রামক ভাইরাস ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি
নিপাহ বা বার্ড ফ্লুর মতো ভাইরাসগুলোর রূপ পরিবর্তন নিয়ে মোস্তফা আজিজ বলেন, সংক্রামক ভাইরাসগুলো মিউটেশনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, যা আগে থেকে ধারণা করা প্রায় অসম্ভব। তবে শঙ্কার বিষয় হলো পরিবেশদূষণ ও অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, "এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে যেকোনো নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ বা মহামারিতে বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।"
জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্যানসারের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তন ক্যানসারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে বলে মোস্তফা আজিজ উল্লেখ করেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে, ফলে মিঠাপানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, "এই পরিবর্তনগুলো বহুমাত্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের ফলে অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি আসছে, যা স্কিন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।" জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশের ক্ষতি নয়, সরাসরি ক্যানসারসহ নানা প্রাণঘাতী রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
খাদ্যে ভেজাল ও অ্যান্টিবায়োটিকের মারাত্মক পরিণতি
ব্রয়লার মুরগি বা গবাদিপশুতে অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েডের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে মোস্তফা আজিজ বলেন, এটি অত্যন্ত মারাত্মক এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগিতে ইস্ট্রোজেন ইনজেকশন দেওয়ার কারণে এই উপমহাদেশের অল্পবয়সী মেয়েদের মধ্যে ‘আর্লি ব্রেস্ট ক্যানসার’ বা অকাল স্তন ক্যানসারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, "খাদ্যে ভেজাল ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সরাসরি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।"
ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা: ক্যানসার সুনামির আশঙ্কা
দূষণ ও ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়ে মোস্তফা আজিজ বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ক্যানসারের একটি ‘সুনামি’ দেখা দিতে পারে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "এটি কোনো কাল্পনিক শঙ্কা নয়; বরং বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহ ইঙ্গিত। যদি এখনই দূষণ, খাদ্যে ভেজাল ও স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।"
মোস্তফা আজিজের এই সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্য অর্জনে গবেষণা, পরিবেশ সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্ব ফুটে উঠেছে।



