লালমনিরহাটের তিস্তা রেলসেতুসংলগ্ন নদীতে নেমে কয়েক হাজার মানুষ প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন কর্মসূচি পালন করেন। ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি।
পদ্মা ব্যারাজে নিজস্ব অর্থ, তিস্তায় ঋণের খোঁজ
গত ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেকে) সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের জন্য ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। এই টাকার উৎস সরকারের রাজস্ব খাত। এই খবর দেখার পর থেকে তিস্তাতীরবর্তী মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তাদের একটাই কথা, তিস্তা মহাপরিকল্পনার জন্য মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ না দিয়ে খোঁজা হচ্ছে ঋণ। আর পদ্মা ব্যারাজের জন্য দেওয়া হলো নিজস্ব অর্থ বরাদ্দ। অনেকে ফেসবুকে লিখেছেন ‘আন্দোলন তিস্তায়, প্রকল্প পদ্মায়’।
তিস্তার ভাঙনে লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে অনেকে লিখেছেন তাদের হতাশার কথা। এই হতাশা কোনোভাবেই অমূলক নয়। তিস্তার দুই পাশে ভাঙনে লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। অগণিত মানুষ আছে, যাদের বাড়ি অন্তত ৮-১০ বার ভেঙেছে। উদ্বাস্তু মানুষগুলোর পারিবারিক সম্পর্কও ভেঙে গেছে। পরিবারের একেক সদস্য বেঁচে থাকার তাগিদে দেশের একেক প্রান্তে ছুটে গেছে। বাবা-সন্তান, ভাই-ভাই, ভাই-বোন, বন্ধু, প্রতিবেশী সব রকম সম্পর্কের কবর রচিত হয় তিস্তার ভাঙনে। সম্প্রতি তিস্তাপারের এক ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘তিস্তার পাড় ভাঙা মানুষকে দেশের সব বড় বড় বস্তিতে পাওয়া যাবে। দেশের সব জেলায় শ্রম বিক্রি করছে তিস্তাতীরবর্তী মানুষ।’
নদীভাঙা মানুষের করুণ ইতিহাস
শত বিঘা জমির মালিক রাতারাতি কপর্দকশূন্য হয়েছেন। অগণিত মানুষের মর্মান্তিক আখ্যানে পূর্ণ তিস্তার সুপার। তিস্তার দুই পারে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে মানুষের বাড়ি ভাঙেনি। তিস্তাপারে এমনও দেখেছি বৃদ্ধা তাঁর স্বামীর কবর আঁকড়ে ধরে আছেন। রাত হয় তবুও সরে আসেন না। কবর নদীতে ভেঙে যাচ্ছে, তবুও কবর ধরে থাকেন। স্বামীর কবর চলে যাবে, এটা কিছুতেই মানতে পারেন না। দেখেছি এক বৃদ্ধা প্রচণ্ড বৃষ্টিতে কাদামাটিতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছেন, আর নদীর ভেতরে নিজের ঠিকানা দেখাচ্ছেন। তাঁর মেয়ে কিছুতেই তাঁকে বাড়িতে নিতে পারছেন না।
তিস্তাপারের মানুষের দুঃখগাথা শুনতে শুনতে নিজে কত দিন চোখের পানি মুছেছি, তার কোনো অন্ত নেই। এই তো কিছুদিন আগে এক বয়স্ক লোকের সঙ্গে নদীর ভাঙনের আলাপ করছিলাম। নদী কর্মী হামিদুল ইসলাম ভিডিও করছিলেন। বৃদ্ধ ব্যক্তি নিজের বাড়ি ভাঙার কথা বলা শুরু করার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন। অবস্থা এমন হলো হামিদুল আর ভিডিও করতে পারলেন না। আমিও চোখের পানি মুছতে থাকলাম। একের পর এক সাজানো–গোছানো সংসার কীভাবে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
সরকারের ক্ষতিপূরণে বৈষম্য
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যাঁরা থাকেন, তাঁদের নদীভাঙা মানুষের কষ্ট স্পর্শ করে কি না, জানা নেই। তাঁদের কাছে হয়তো এসব সংখ্যা নিছক ঘটনামাত্র। কিন্তু যার বাড়ি ভেঙে যায়, তার কাছে তো নিঃস্ব হওয়াই বাস্তবতা। নদীভাঙা মানুষের করুণ ইতিহাস শেষ হওয়ার নয়।
রংপুর অঞ্চল ছাড়া দেশের যেকোনো জায়গায় যখনই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে, তখনই সরকার তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেছে। নিশ্চয়ই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের কথা মনে আছে। নোয়াখালী-কুমিল্লা অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সেই সময়ে প্রধান উপদেষ্টা তাদের জন্য বিশেষ ত্রাণের ব্যবস্থা করেছিলেন। ওই বছরেই রংপুর অঞ্চলে তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানিতে বন্যা এবং ভাঙনের শিকার একজন মানুষও ক্ষতিপূরণ পায়নি। ওই সময়ে প্রথম আলো পত্রিকায় লিখেছিলাম ‘গরিবের কান্না কান্না নয়, গরিবের বন্যা বন্যা নয়’।
গতিয়াশাম মৌজায় ৫৫০ পরিবার গৃহহীন, কেউ ক্ষতিপূরণ পায়নি
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিস্তাপারের গতিয়াশাম নামক একটি মৌজায় কতটি পরিবার গৃহহীন হয়েছে, তার একটি জরিপ করেছি। এই মৌজায় ভাঙনের শিকার সাড়ে পাঁচ শ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করেছি। এদের একজনও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড ওই কয়েক বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। কিন্তু মাত্র ৫ কোটি টাকা ব্যয় করলে ওই বাড়িগুলোর একটিও ভাঙত না। সেই ভাঙন বন্ধের কাজ করেনি। কী অবিশ্বাস্য! একটি পরিবারের পাশেও সরকার দাঁড়ায়নি। তিস্তাপারের জন্য এটাই বাস্তবতা!
তিস্তা আন্দোলনের ইতিহাস
তিস্তা নদী সুরক্ষার জন্য মানুষ কার কাছে যাবে? দেশেই কেবল নয়, গোটা দুনিয়ায় একক কোনো নদীর জন্য এত বড় বড় আন্দোলন হয়েছে কি না সন্দেহ, তিস্তাকে নিয়ে যত বড় বড় আন্দোলন হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী তিস্তা আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। তিস্তাতীরবর্তী সংসদীয় আসনের একটিতে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগান ধারণ করে ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। নির্বাচনের আগে এই সংগঠন যে আন্দোলন করেছে তা মানুষ দেখেছে। লাখো লাখো জনতা এই আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। লন্ডনে থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (সেই সময়ের বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান) তিস্তা সুরক্ষায় অগ্রাধিকারের কথা বলেছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় একই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
তিস্তা সমীক্ষা ১০ বছরেও শেষ হয়নি
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০০ দিন শেষ হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন রকম আলোচনা জারি আছে। চীনের সঙ্গে ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে ঋণ গ্রহণের বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে এমনটা অনেকেই মনে করছেন। এরই মধ্যে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, ‘তিস্তা নিয়ে বলার এখনো সময় আসেনি।’ এই কথা বলার কারণ হিসেবে তিনি তিস্তায় সমীক্ষা না হওয়ার কথা বলেছেন। ২০১৬ সালে শুরু হয়েছে তিস্তা সমীক্ষার কাজ। ১০ বছরেও সেই কাজ শেষ হয়নি। তাহলে এই যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ হচ্ছে হচ্ছে বলে কালক্ষেপণ করা হলো, সবটাই প্রতারণামূলক?
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও তিস্তা অবহেলিত
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে দেশে ১০টি মেগা প্রকল্প ছিল। এতে ব্যয় ছিল তিন লক্ষাধিক কোটি টাকার। এই সময়ে তিস্তা নদীর সুরক্ষার জন্য মাত্র সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার সেই টাকার ব্যবস্থা করেনি।
তিস্তা বনাম পদ্মা: বাঁচা-মরার লড়াই বনাম জীবনমান উন্নয়ন
তিস্তাপারের মানুষ তিস্তার সুরক্ষা চায়। তিস্তার দুপারে মানুষের বাঁচা–মরার লড়াই। এই তিস্তায় প্রকল্প গ্রহণের আগে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। তিস্তার জন্য যেখানে টাকা খুঁজতে এক দশক চলে গেল, সেখানে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প গ্রহণ করা হলো। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ের জন্য প্রয়োজনীয় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার সবটাই সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করার অনুমোদন দিয়েছে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হলো মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রকল্প। তিস্তা হলো মানুষের বাঁচা-মরার লড়াই থেকে রক্ষা করার প্রকল্প। অতীতের সরকারগুলো তিস্তাপারের মানুষের করুণ আখ্যানকে গুরুত্ব না দিয়ে নিরাপদে থাকা জনগণের জীবনমান আরও উন্নত করার প্রকল্প সব সময় গ্রহণ করেছে। এখনো কি তা–ই হবে?
তিস্তাপারের মানুষের বড় প্রশ্ন
তিস্তাপারের মানুষের কাছে তাই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে নিজস্ব অর্থায়নে যদি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প গ্রহণ করা যায়, তাহলে তিস্তার জন্য কেন মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিস্তাপারের মানুষ চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়েছে। চীনের কাছে পদ্মা ব্যারাজের টাকা ঋণ নিতে পারত সরকার। নিজেদের অর্থে করতে পারত তিস্তা মহাপরিকল্পনা। নাকি চীন পদ্মা ব্যারাজে টাকা দিতে চায় না। অবশ্য পদ্মা ব্যারাজ লাভের বদলে ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফলে অনেকেই এই প্রকল্পে টাকা না–ও দিতে পারে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হলো মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রকল্প। তিস্তা হলো মানুষের বাঁচা-মরার লড়াই থেকে রক্ষা করার প্রকল্প। অতীতের সরকারগুলো তিস্তাপারের মানুষের করুণ আখ্যানকে গুরুত্ব না দিয়ে নিরাপদে থাকা জনগণের জীবনমান আরও উন্নত করার প্রকল্প সব সময় গ্রহণ করেছে। এখনো কি তা–ই হবে?
রোগী মৃত্যুযন্ত্রণায়, ডাক্তার সুস্থের চিকিৎসা
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফেসবুকে লিখেছেন ‘রোগী মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, আর ডাক্তার সুস্থ লোকের চিকিৎসা করছে।’ ফ্যাক্ট: তিস্তা মহাপরিকল্পনা।
এই টাকার জন্য বিভিন্ন সংস্থা তথা দেশের কাছে ঋণ চাওয়া হয়েছিল। এই ঋণ দিতে সম্মত হয়েছিল চীন। ভারতের কাছে তখন বাংলাদেশ ছিল সীমাহীন নতজানু। ফলে ভারতের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে চীনের টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কিছুটা প্রশ্নের মধ্যে পড়ে। চীন-ভারতের মাঝামাঝি পিষ্ট হয় তিস্তা সুরক্ষার পরিকল্পনা।
তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদীবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
*মতামত লেখকের নিজস্ব



