ঢাকার কল্যাণপুর থেকে প্রতিদিন পুরানা পল্টনে অফিসে যাতায়াত করেন আরিফুল হক। একটি ট্রাভেল এজেন্সির কর্ণধার তিনি। লতিফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাসগুলোতে উঠা যায় না। উবারে গেলে ভাড়া গুনতে হয় ৪০০ টাকার মতো। এসি বাস থাকলে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করা যেত। কিন্তু যে রুটে লতিফুল হক চলেন, সেই রুটে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কোনো বাস নেই। তাঁর মতো অনেকেই এসি বাস পেলে তাতেই যাতায়াত করতেন। কিন্তু প্রায় দেড় কোটি মানুষের এই শহরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস এখন হাতে গোনা। নন-এসি বাসগুলোরও লক্কড়ঝক্কড় অবস্থা, রং চটা, দরজা-জানালা-লাইট ঠিক নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৬৯০টি নতুন এসি বাস নামানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলো ছয় মাসেও ডিজেলচালিত এসি বাসগুলো নামাতে পারেনি। এখন সরকার জোর দিচ্ছে ইলেকট্রিক বাসে।
নতুন পরিকল্পনা: ইলেকট্রিক বাস
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নতুন সরকার বাস অনুমোদন দেওয়ার পদ্ধতি, বাসের ধরন ও ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। তা থেকেই ইলেকট্রিক বাস নামানোর এই পরিকল্পনা। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে, নতুন বাসে স্বয়ংক্রিয় দরজা খোলা-বন্ধের (অটো-ডোর) এবং ই-টিকেটিং ব্যবস্থা থাকবে। সুশৃঙ্খল বাস ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে চালকের সঙ্গে চুক্তিতে নয়, কাউন্টারভিত্তিক সেবা চালু হবে। বাস থাকবে চকচকে। বাসের গায়ে রুট নম্বর ও কোম্পানির নাম স্পষ্টভাবে লেখা থাকবে। একই কোম্পানির সব বাসের রং অভিন্ন হবে। বাসগুলো চলবে বড় কোম্পানির অধীন ফ্রাঞ্চাইজির ভিত্তিতে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, সরকার জ্বালানি সাশ্রয় ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা—এ দুটি বিষয়ে জোর দিয়েছে। এ জন্য ইলেকট্রিক বাস সরকারিভাবে আমদানির পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি সব দিক থেকেই ঢাকায় মানসম্মত বাস নামানোর জন্য চেষ্টা চলছে। শিগগিরই ভালো কিছু দেখা যাবে।
অনুমোদন নিয়েও নামেনি ৬৯০টি এসি বাস
ঢাকায় বাস চলাচলের অনুমোদন (রুট পারমিট), নতুন রুট নির্ধারণ এবং পরিবহন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম তদারক ও নিয়ন্ত্রণ হয় ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (মেট্রো আরটিসি) মাধ্যমে। পদাধিকারবলে এ কমিটির প্রধান ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার। বিআরটিএর ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সাল থেকে দীর্ঘদিন মেট্রো আরটিসির কার্যক্রম বন্ধ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুনরায় কার্যকর হয় আরটিসি। গত বছরের ৬ নভেম্বরের সভায় ২২টি রুটে ৩ হাজারের বেশি এসি ও নন-এসি বাসের জন্য আবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। তবে কমিটি নন-এসি বাসের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু ১০টি রুটে ৬৯০টি এসি বাসের অনুমোদন দেওয়া হয়। ছয় মাসের মধ্যে এসব বাস নামানোর সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এর মধ্যে কোনো বাস নামেনি। কোম্পানিগুলোর সূত্র জানিয়েছে, তাদের কেউ এখনো এসি বাস আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে পারেনি। অধিকাংশ কোম্পানি ভারত ও চীনের কোম্পানির সঙ্গে কথা বলছে। কিন্তু ব্যয়ে কুলাতে পারছে না। কেউ কেউ পুরোনো দূরপাল্লার এসি বাস এনে নগরে চালুর চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে সরকার পুরোনো বাসের অনুমতি দেবে না বলে জানা গেছে।
শাপলা পরিবহনের উদ্যোগ
আরটিসির সভা সূত্র জানায়, ২০০টি এসি বাস চালানোর অনুমতি পায় শাপলা পরিবহন, যেগুলো সাভারের চন্দ্রা থেকে মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, হাজারীবাগ, নয়াবাজার হয়ে ধোলাইখাল পথে চলাচল করার কথা। শাপলা পরিবহনের মালিক গোলাম জিলানী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ভারতের বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে আলাপ করছেন। কিন্তু এখনো বাস আমদানির পর্যায়ে যেতে পারেননি। অনুমোদিত রুটের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করবেন তিনি।
চিত্রা পরিবহন ও টাইম বার্ড
চিত্রা পরিবহন লিমিটেড ১২০টি এবং টাইম বার্ড এক্সপ্রেস ১০০টি এসি বাস নামানোর অনুমতি পেয়েছে। এর মধ্যে চিত্রা পরিবহন চলার কথা সাভারের জিরানী থেকে গাবতলী, ফার্মগেট, মগবাজার, খিলগাঁও, শনির আখড়া হয়ে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত। টাইম বার্ড চলার কথা সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর, উত্তরা হয়ে গাজীপুরের কালীগঞ্জ পর্যন্ত। চিত্রা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম সরদার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরাও কোনো বাস নামানোর পর্যায়ে যেতে পারেননি। পুরোনো বাস জোগাড় করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তারা এসি বাসের চেয়ে নন-এসি বাসের রুটের জন্য বেশি জোর দিয়েছিলেন, কিন্তু সরকার এসি বাসে জোর দিয়েছে। চিত্রা পরিবহন নন-এসি বাসেরও অনুমতি পেয়েছে। সেগুলো নামানোর চেষ্টা চলছে।
অন্যান্য কোম্পানি
তাদের বাইরে আরও যেসব কোম্পানি এসি বাস নামানোর অনুমতি পেয়েছে, এর মধ্যে স্প্রিন্ট শ্যাটল প্রাইভেট লিমিটেডের ১০০টি (দুটি ভিন্ন রুটে), ইকবাল এন্টারপ্রাইজ ও নিউ ঢাকা পরিবহনের ৫০টি করে বাস নামানোর কথা। স্প্রিন্ট শ্যাটলের একটি পথ হচ্ছে সাভারের জিরানী থেকে চিটাগাং রোড পর্যন্ত এবং অন্যটি বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল থেকে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি। ইকবাল এন্টারপ্রাইজ চলবে উত্তরা মেট্রোরেল স্টেশন থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত। ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেস সেনানিবাস থেকে জলসিঁড়ি পর্যন্ত ৪০টি বাস চালানোর অনুমতি পেয়েছে। গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জ পথে ৩০টি এসি বাস চালানোর অনুমতি পেয়েছে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট লাইন।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও আরটিসির সদস্য সাইফুল আলম বলেন, ১০টি কোম্পানির কেউ কেউ বাস আমদানির চেষ্টা করছে, তবে সবাই পারবে কি না, নিশ্চিত নয়।
এসি বাস যেভাবে উধাও
দুই যুগ আগে মতিঝিল থেকে উত্তরা এবং সাভারের পথে প্রিমিয়াম সার্ভিসের এসি বাস চালু ছিল। সাভার থেকে মতিঝিল পথে নিরাপদ ও ট্রান্স মিলেনিয়ামের এসি বাসও চলত। এরপর বিভিন্ন সময় ঢাকা ও এর আশপাশে এসি বাস নামলেও তা টেকেনি। বর্তমানে বনানী, গুলশান ও বারিধারার মধ্যে ঢাকা চাকা নামে এসি বাস চলে, এই রুট খুবই সংক্ষিপ্ত। এর বাইরে সাভার থেকে মতিঝিলের পথে লাল-সবুজ এসি বাস কিছুদিন চলার পর আর দেখা যায় না। সরকারি সংস্থা বিআরটিসি কিছু এসি বাস মতিঝিল-উত্তরা পথে চালু করেছিল, তবে এখন সেগুলোও নেই।
রাজধানী ঢাকার গণপরিবহনের মধ্যে সর্বশেষ সংযোজন মেট্রোরেল, যা ২০২২ সালে চালু হয়েছে। এসি এই ট্রেনের চাহিদা বিপুল। কিন্তু ঢাকার মতো বড় শহরে একটিমাত্র রুটে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ট্যাক্সিক্যাব উধাও হয়ে গেছে। রাইড শেয়ারিং সেবা উবারও সংখ্যায় খুব কম। এই পরিস্থিতিতে এসি বাস বেশি সংখ্যায় নামলে নগরের যাত্রীদের স্বস্তি আনবে বলে মনে করছেন অনেকেই।
পুরোনো বাসে ভরা ঢাকা
ঢাকার রাস্তা থেকে পুরোনো বাস তুলে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছিল দেড় দশক আগে। আওয়ামী লীগ সরকার তা পারেনি। কারণ, দলটির নেতারাই ছিলেন বাসমালিক ও নিয়ন্ত্রক। সরকারের যেকোনো উদ্যোগে তাঁরা বাধা হয়ে দাঁড়াতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার এসে গণপরিবহন নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
বিআরটিএর হিসাবে, বর্তমানে ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ হাজার ১৯৮টি। ঢাকায় নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ৫৪ হাজারের মতো। অর্থাৎ ৩০ শতাংশ বাস-মিনিবাস মেয়াদোত্তীর্ণ (২০ বছরের বেশি বয়সী)। বিআরটিএ সূত্র বলছে, এগুলোর একটা বড় অংশই দূরপাল্লার পথে চলাচল করে। এগুলো ঢাকা ও এর আশপাশের জেলা থেকে নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। ফলে রাজধানীতে চলাচলকারী মেয়াদোত্তীর্ণ বাস-মিনিবাসের হার আরও বেশি।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য বলছে, মহানগরীর ১২৮টি রুটে ৭ হাজার ৯১টি বাস নিবন্ধিত থাকলেও বাস্তবে রাস্তায় চলে মাত্র ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার বাস। তবে এসব বাসের অনেকটি যে রুটে চলবে বলে অনুমতি নেওয়া হয়েছিল, সেই রুটে চলছে না। নির্ধারিত রুটে চলছে ৩ হাজার ৪২৭টি বাস। অন্য রুটে যাতায়াত করছে ২ হাজার ১৮টি। ১ হাজার ৬৪৬টি বাসের কোনো রুট পারমিটই নেই।
বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ে। কারণ, প্রতিদিনই কোনো না কোনো যানবাহনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। সে হিসাবে সংখ্যাটা আরও বেশি হবে। এ ছাড়া ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই, এমন যানবাহন এই মেয়াদোত্তীর্ণ যানের মধ্যে পড়ে না।
বিশৃঙ্খলা রুট ব্যবস্থা
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য বলছে, মহানগরীর ১২৮টি রুটে ৭ হাজার ৯১টি বাস নিবন্ধিত থাকলেও বাস্তবে রাস্তায় চলে মাত্র ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার বাস। তবে এসব বাসের অনেকটি যে রুটে চলবে বলে অনুমতি নিয়েছিল, সেই রুটে চলছে না। নির্ধারিত রুটে চলছে ৩ হাজার ৪২৭টি বাস। অন্য রুটে যাতায়াত করছে ২ হাজার ১৮টি। ১ হাজার ৬৪৬টি বাসের রুট পারমিটই নেই। ঢাকায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অনুমোদিত বাস রুটে রয়েছে ৩৮৮টি, তবে ২৫০টির বেশি রুট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
পরিবহন–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এখন বাস চলাচল করে কোম্পানির নামে। তবে রুট পারমিট হয় মালিকের নামে। ফলে শৃঙ্খলা থাকে না। সব বাসের নিবন্ধন ও রুট পারমিট কোম্পানির নামে হলে আইন প্রয়োগে সুবিধা হয়।
বাসের রুট পারমিট দেওয়ার বর্তমান পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একেকটি কোম্পানির আবেদনের ভিত্তিতে রুট পারমিট দিলে বাস ঠিকমতো নামানো হয় না। নামলেও মান ঠিক থাকে না। এ জন্য অল্প কিছু কোম্পানির অধীন ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক আধুনিক বাস নামানো দরকার।
২০১৮ সালে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বোর্ড সভা সিদ্ধান্ত হয়েছিল, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা (বাস রুট র্যাশনালাইজেশন) প্রবর্তনের অংশ হিসেবে ঢাকায় নতুন করে বাসের রুট পারমিট দেওয়া হবে। এরপর ২০১৯ সাল থেকে মেট্রো আরটিসিকে নতুন করে বাসের রুট পারমিট না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। রুট র্যাশনালাইজেশনের আওতায় এরপর কয়েকটি পথে বাস নামানো হয়েছিল, তবে এ ব্যবস্থাও বেশি দিন টেকেনি।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নিজে এবং অন্য পরিবহনের মালিকদের নিয়ে ১০০ ইলেকট্রিক বাস দিয়ে একটি বাস রুট চালুর চেষ্টা চালাচ্ছেন।



